• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

স্টুডিও ধ্বংস, টিকে আছে ঐতিহ্য: সুদানের সংস্কৃতি রক্ষায় শিল্পীদের লড়াই

প্রকাশিত: ২২:০১, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২২:০২, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
স্টুডিও ধ্বংস, টিকে আছে ঐতিহ্য: সুদানের সংস্কৃতি রক্ষায় শিল্পীদের লড়াই

যুদ্ধের ভয়াবহতায় ঘরবাড়ি, স্টুডিও ও শিল্পচর্চার সরঞ্জাম হারিয়েছেন সুদানের অনেক শিল্পী। বাস্তুচ্যুত হয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন পোর্ট সুদানে। তবু থেমে নেই তাঁদের সৃষ্টিশীলতা। নাটক, সংগীত, চিত্রকলা ও কারুশিল্পের মাধ্যমে দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছেন আওয়াদ হারুন, আসিম আবদেল আজিজসহ অনেক শিল্পী।

সুদানের রাজধানী খার্তুমের উত্তরের আল-হালফায়ায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন ৪৫ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী ও নাট্যপরিচালক আওয়াদ হারুন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী (এসএএফ) ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে পরিবার নিয়ে পালিয়ে পোর্ট সুদানে আশ্রয় নেন তিনি।

বাড়ি ছাড়ার সময় সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন মাত্র দুটি শার্ট, দুই জোড়া প্যান্ট, দুটি বই ও কয়েকটি ছেঁড়া আঁকার কাগজ। ভেবেছিলেন, দ্রুতই বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় হারাতে হয়েছে শুধু বাড়িই নয়, শিল্পচর্চার কর্মশালা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জীবিকা নির্বাহের উপায়ও।

পোর্ট সুদানে গিয়ে ভাস্কর্য, নকশা ও সাজসজ্জার কাজ করে আয় করার চেষ্টা করেন আওয়াদ। পাশাপাশি ইউনেসকো ও আহালিনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওয়াসেল উৎসবে নাট্য পরিবেশনায় অংশ নেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিচালনা করেন ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার কর্মশালাও।

২০১৩ সালে একদল তরুণকে সঙ্গে নিয়ে আহালিনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন আওয়াদ। নাটক, চিত্রকলা, সংগীত ও পুতুলনাট্যের মাধ্যমে তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সংগঠনটির লক্ষ্য। শিশুদের জন্য ছবি আঁকা, গল্প বলা, গান ও খেলাধুলার আয়োজনও করে সংগঠনটি। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারছে।

আলজাজিরাকে আওয়াদ বলেন, ‘আমার সরঞ্জাম হারানোর অর্থ এই নয় যে আমার দক্ষতাও হারিয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্র হারানোর অর্থ এই নয় যে আমার সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।’

আওয়াদসহ বাস্তুচ্যুত কয়েকজন শিল্পী পোর্ট সুদানের একটি পুরোনো বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তারা নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বসবাসের উপযোগী করে তোলেন ভবনটি। তবে এখন উচ্ছেদের আশঙ্কায় তাদের আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে। আওয়াদের ভাষায়, ‘এখন আমাদের উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপর কোথায় যাব, তা নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় আছি।’

তার বিশ্বাস, শিল্পকলা হারানো বাড়ি ফিরিয়ে দিতে কিংবা যুদ্ধ থামাতে না পারলেও মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, সমাজকে একত্র করতে পারে এবং শিশুদের জন্য আনন্দ ও অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। আহালিনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মূলমন্ত্র—‘ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমরা উঠে দাঁড়াব।’ আওয়াদের কাছে এটি কেবল স্লোগান নয়, বরং সব হারিয়েও সৃষ্টিশীলতা ধরে রাখার প্রেরণা।

যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে সুদানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, ব্যাহত হয়েছে শিল্পীদের জীবিকা। ২০২৬ সালের জুনে ইউনেসকো জানায়, দেশটির সাংস্কৃতিক খাতে প্রায় ৩ কোটি ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। তবে এই আর্থিক সংকটের পেছনে রয়েছে আরও অনেক ব্যক্তিগত ক্ষতি। যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন শিল্পীরা; আবার অনেকে ছেড়ে এসেছেন নিজেদের স্টুডিও, গ্যালারি, শিল্পকর্ম ও কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ইউনেসকো জানায়, পোর্ট সুদানের শিল্পী ও লেখক ইউনিয়ন ১১২ জনের বেশি বাস্তুচ্যুত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক পেশাজীবীকে আশ্রয় দিয়েছিল। সংকটের মধ্যেও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউনেসকো জানায়, পোর্ট সুদানে তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ৩৫০ জনের বেশি শিল্পী, নারী, কিশোরী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত সাংস্কৃতিক পেশাজীবী উপকৃত হয়েছেন।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার এই লড়াইয়ে যুক্ত রয়েছেন ৩১ বছর বয়সী সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা আসিম আবদেল আজিজও। উত্তর কোরদোফান রাজ্যের রাজধানী এল-ওবেইদে বসবাস করতেন তিনি। সেখানে সংঘাত বৃদ্ধি ও বারবার ড্রোন হামলার কারণে ২০২৩ সালের নভেম্বরে নিরাপদ আশ্রয় ও কাজের সন্ধানে পোর্ট সুদানে চলে আসেন।

তার পরিবার ছড়িয়ে রয়েছে ওমদুরমান ও এল-ওবেইদে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের জন্য তৈরি একটি আশ্রয়কেন্দ্রে একাই থাকেন আসিম। যুদ্ধ তাঁর জীবন ও পেশাকে এলোমেলো করে দিলেও সংগীতের মাধ্যমে সুদানের ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি।

পোর্ট সুদানে স্থানীয় শিল্পী ও লেখক ইউনিয়ন, ইউনেসকো এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন আসিম। সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্য শিল্পীদের সঙ্গে মিলে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও বর্ণবাদসহ সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে সংগীতভিত্তিক কর্মসূচিও পরিচালনা করছেন।

আসিমের মতে, যুদ্ধ সুদানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব বিভেদ দূর করতে শিল্পকলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংগীতের মাধ্যমে বৈচিত্র্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।

আলজাজিরাকে আসিম বলেন, ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলে, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সংগীতের মাধ্যমে সুদানের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমরা সবাই ভাই-বোন। যুদ্ধ আমাদের প্রকৃত পরিচয় নয়।’

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও সুর সংরক্ষণে এক বছর আগে ‘মোখালায়া’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করেন আসিম। এর মাধ্যমে সুদানের বিভিন্ন এলাকার লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী সুর সংগ্রহ, নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে প্রকল্পটি তুলে ধরতে চান তিনি, যাতে বিশ্বের মানুষ সুদানের সমৃদ্ধ সংগীত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে পারে।

আসিমের মতে, ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু অতীতকে বাঁচিয়ে রাখার বিষয় নয়; যুদ্ধের মধ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন ও সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও সুদানের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখারও একটি উপায়।

রেড সি স্টেটের শিল্পী ও লেখক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদেলকাদের হাশেম জানান, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা শিল্পী ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা দিয়ে আসছে সংগঠনটি।

তিনি বলেন, ‘পোর্ট সুদানের একটি বিদ্যালয়ে বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে আমরা কাজ করেছি। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তাও চেয়েছি।’

শুধু আশ্রয় দেওয়াই নয়, পোর্ট সুদানের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে ইউনিয়নটি। মাদক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতেও তাঁরা যুক্ত হয়েছেন।

হাশেম আরও বলেন, ‘ইউনেসকোর সঙ্গে অংশীদারত্বে বাস্তুচ্যুত শিবিরের শিশুদের কারুশিল্প শেখানোর প্রকল্পও বাস্তবায়ন করেছি। এর মধ্যে কংক্রিট দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণও রয়েছে।’

তবে সুদানের সেনাবাহিনী রাজধানী খার্তুম পুনর্দখল করার পর বাস্তুচ্যুত অধিকাংশ শিল্পী নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন বলে জানান হাশেম।

সূত্র: আলজাজিরা

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: