ইউক্রেনে পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা, জরুরি অ্যাপ হ্যাক!
ছবি: বিবিসি
ইউক্রেনের জাতীয় জরুরি সতর্কবার্তা অ্যাপে সাইবার হামলা চালিয়ে রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দাদের কাছে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়েছে হ্যাকাররা। রবিবার (১ নভেম্বর) স্থানীয় সময় রাত ১১টার কিছু আগে পাঠানো এসব বার্তায় পারমাণবিক বিকিরণ, রাসায়নিক হামলা এবং বিভিন্ন সড়কে সংঘর্ষের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বাসিন্দাদের মধ্যে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ্যাপটির কার্যক্রমে অননুমোদিত ব্যক্তিরা হস্তক্ষেপ করেছে।
ইউক্রেনের জরুরি সতর্কবার্তা অ্যাপটিতে রোববার রাতে পারমাণবিক বিকিরণের উচ্চ ঝুঁকির কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে রাজধানীতে রাসায়নিক হামলা এবং সড়কে সড়কে লড়াইয়ের আশঙ্কার কথাও বলা হয়। ইংরেজি ও ইউক্রেনীয় ভাষায় পাঠানো এসব বার্তায় বানান ভুল ছিল।
অনেক বাসিন্দা অ্যাপটি হ্যাক হয়েছে বলে ধারণা করে সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করেন। তবে কেউ কেউ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিনা নামের এক নারী বলেন, ‘কিছুক্ষণের জন্য আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম, এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে।’
রুশ ভাষায় পাঠানো আরেকটি বার্তায় দাবি করা হয়, ইউক্রেনে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে যাচ্ছে। পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়া এর আগে তিনবার ব্যবহার করেছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল কিয়েভ অঞ্চল এবং দিনিপ্রো ও লভিভ শহর।
রবিবার এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের জরুরি সতর্কবার্তা অ্যাপ কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘অননুমোদিত পক্ষ’ অ্যাপটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অ্যাপটির একটি চ্যানেল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, সন্দেহজনক বিজ্ঞপ্তিতে থাকা লিংকে ক্লিক না করতে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা হয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) পর্যন্ত হামলাটি কারা চালিয়েছে বা এর উদ্দেশ্য কী, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে রাশিয়ার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মস্কোভিত্তিক জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের অ্যাপে প্রবেশ করেও হ্যাকাররা সেখানে ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
এ হামলার সঙ্গে হ্যাকিং গোষ্ঠী ‘হিটকোর’-এর সম্পৃক্ততার কথা একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়। রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে পরিচিত টেলিগ্রাম চ্যানেল ‘মাশ’ জানিয়েছে, তারা হিটকোরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং গোষ্ঠীটি হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইউক্রেনে পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ার সময়ই দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খেরসনে আবারও হামলা শুরু করে রাশিয়া। এর কয়েক ঘণ্টা আগে স্থানীয় একটি যুদ্ধবিরতি শেষ হয়। ওই বিরতির সময় রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন ওলেশকি শহর থেকে কয়েক শ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
খেরসনের সামরিক প্রশাসন জানায়, সোমবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে রাশিয়ার একটি ড্রোন হাসপাতালে আঘাত হানে। হামলার পর হাসপাতালের কক্ষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জানালা ভেঙে যায় এবং দরজা ভেঙে ধ্বংসাবশেষ রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হননি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ছয় দিনের ওই যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির সুযোগে রুশ সেনারা ওলেশকিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে এবং নতুন সেনা মোতায়েন করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ সময় হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মরদেহও সরিয়ে নেওয়া হয়।
স্কাই নিউজকে দেওয়া ভিডিও ফুটেজে রুশ সেনাদের ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। সম্প্রচারমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনারা পোড়া বাড়ি ও ভবনে বড় বড় ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ কক্ষে চলে যান। শহরের রাস্তায় সাঁজোয়া যান চলাচলের দৃশ্যও দেখা গেছে।
দিনিপ্রো নদীর বিপরীত তীরে অবস্থিত ওলেশকি শহরটি খেরসন থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে। ইউক্রেনের আত্মঘাতী ড্রোন হামলার আশঙ্কায় যুদ্ধবিরতির আগে সেখানে রুশ সেনাদের সরবরাহ পৌঁছানো কঠিন ছিল।
ইউক্রেনের ৩৪তম স্বতন্ত্র মেরিন ব্রিগেডের কমান্ডার দিমিত্রি পুলিনেতস স্কাই নিউজকে বলেন, আগে রুশ সেনারা দিনের বেলা, রাতের বেলা কিংবা খারাপ আবহাওয়ায়ও শহরটিতে যানবাহন নিয়ে চলাচল করতে পারতেন না। তবে এখন তাদের সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং গত কয়েক দিন ধরে সেখানে নিয়মিত সেনা চলাচল চলছে।
রবিবার রাত ১১টায় ছয় দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়। ২০২২ সালের পর এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় যুদ্ধবিরতি হিসেবে উল্লেখ করে দুই পক্ষই একে সফল বলে দাবি করেছে।
ওলেশকিতে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সমন্বয় করতে যাওয়া ইউক্রেনের ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেতস বলেন, খেরসন অঞ্চলের রুশ-অধিকৃত অন্যান্য শহরেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তবে ওলেশকি থেকে কতজন ইউক্রেনে এবং কতজন রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে সংখ্যা প্রকাশ করেননি তিনি। মস্কোর সঙ্গে হওয়া চুক্তির কারণে তথ্যটি গোপন রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইউক্রেনের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরিয়ে নেওয়া অধিকাংশ মানুষকে বহনকারী বাস ক্রিমিয়া হয়ে ইউক্রেনের দিকে যায়। সেখান থেকে বিমানে তাঁদের বেলারুশের গোমেল শহরে নেওয়া হয়। মেলানিয়া ট্রাম্প এক পোস্টে জানিয়েছেন, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ৭৫০ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
লুবিনেতস যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তার সহকারী মার্ক বেকম্যানের মাধ্যমে মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হয়েছে। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ‘হাজারো মানুষ’, যুদ্ধবন্দি এবং ওলেশকির মর্গ থেকে সরিয়ে নেওয়া মরদেহ ফিরিয়ে আনার আশাও প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে এখনো লাখ লাখ মানুষ বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সোমবার জানিয়েছেন, অন্য কোনো এলাকায় নতুন করে যুদ্ধবিরতির তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাদের পুনর্গঠিত হওয়া স্বাভাবিক এবং ইউক্রেনের বাহিনীও একই কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে, ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ভিনিতসিয়া অঞ্চলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ড্রোন হামলায় দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরেক নারী। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন শিশু আহত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: