উত্তর সাগরে বিশালাকৃতির পাথর ফেলছে গ্রিনপিস, নেপথ্যে কি?
উত্তর সাগরের সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকায় শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার ট্রলারের জাল আটকে দিতে সমুদ্রের তলদেশে বিশাল আকারের পাথর ফেলেছে পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ উত্তর সাগর সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় এভাবে পাথর ফেলে একটি প্রতিবন্ধক তৈরি করেছেন সংগঠনটির কর্মীরা। তাদের দাবি, এতে সংরক্ষিত এলাকার একাংশে সমুদ্রের তলদেশ ঘেঁষে টেনে মাছ ধরার ট্রলারের চলাচল বন্ধ হবে এবং সামুদ্রিক প্রাণী সুরক্ষা পাবে।
গ্রিনপিস ইউকে জানিয়েছে, তাদের জাহাজ ‘আর্কটিক সানরাইজ’ থেকে বিশাল পাথর ফেলে পানির নিচে এই প্রতিবন্ধক তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের যেসব সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় সবচেয়ে বেশি তলদেশ-ঘেঁষা ট্রলিং হয়, দক্ষিণ উত্তর সাগর তার অন্যতম।
ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলজুড়ে অবস্থিত দক্ষিণ উত্তর সাগর এলাকায় ডগার ব্যাংকের উত্তরের অংশ থেকে দক্ষিণে ডোভার প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত সামুদ্রিক অঞ্চল রয়েছে। এটি হারবার পরপয়েজ বা এক ধরনের ছোট সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। যুক্তরাজ্যের উত্তর সাগর অঞ্চলে থাকা এই প্রজাতির প্রায় ২০ শতাংশ এখানে বসবাস করে।

তবে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হলেও এর অধিকাংশ অংশে মাছ ধরার ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। ফলে তলদেশ-ঘেঁষা ট্রলার, ড্রেজারসহ বিভিন্ন শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার জাহাজ প্রতিদিন সেখানে মাছ শিকার করে।
গ্রিনপিস ইউকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংরক্ষিত এলাকাটিতে তলদেশ-ঘেঁষা ট্রলারগুলো ৩৭ হাজার ২০০ ঘণ্টার বেশি সময় মাছ ধরেছে। সংগঠনটি এই কর্মকাণ্ডকে মূল্যবান কোনো জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে বুলডোজার চালানোর সঙ্গে তুলনা করেছে।
গ্রিনপিসের সহনির্বাহী পরিচালক উইল ম্যাককালাম বলেন, “বিশাল জাহাজগুলো দিনের পর দিন সমুদ্রে ঘুরে মাছ নিঃশেষ করছে এবং পরপয়েজ, হাঙর ও সামুদ্রিক পাখির মতো মূল্যবান বন্যপ্রাণী হত্যা করছে। আমাদের জাহাজ ও সমর্থকদের নিয়ে আমরা সেই কাজটি করছি, যা সরকারের করার কথা ছিল- আমাদের সমুদ্রকে রক্ষা করা।”
গ্রিনপিস ইউকের দাবি, পাথরের এই প্রতিবন্ধকের ফলে দক্ষিণ উত্তর সাগরের সংরক্ষিত এলাকার ১১৬ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ৪৫ বর্গমাইল অঞ্চলে তলদেশ-ঘেঁষা ট্রলিং কার্যত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

আগামী কয়েক দিন ‘আর্কটিক সানরাইজ’ জাহাজটি ওই এলাকায় টহল দেবে। এর উদ্দেশ্য, অন্য ধরনের শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার কার্যক্রমও নিরুৎসাহিত করা। যুক্তরাজ্যের জাতীয় উদ্যানগুলোর আদলে কর্মীরা এলাকাটিকে ‘সমুদ্র উদ্যান’ ঘোষণা করেছেন।
দক্ষিণ উত্তর সাগরের এই সংরক্ষিত এলাকা সামুদ্রিক পরপয়েজের আবাসস্থল রক্ষার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো, এসব প্রাণীর খাবারের উৎস যেন অক্ষুণ্ন থাকে। গ্রিনপিসের কর্মীদের মতে, ওই এলাকায় নিবিড়ভাবে মাছ ধরার কার্যক্রম সংরক্ষণের এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উইল ম্যাককালাম বলেন, “আমরা জুনেই ঘোষণা দিয়েছিলাম, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে গ্রিনপিস ইউকে সরাসরি পদক্ষেপ নেবে।”
বিবিসির নতুন বন্যপ্রাণীবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্লু প্ল্যানেট থ্রি’-এর যুক্তরাজ্যজুড়ে প্রদর্শন শুরুর সময়েই গ্রিনপিসের এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। ডেভিড অ্যাটেনবরো বর্ণিত এ প্রামাণ্যচিত্রে সমুদ্রের পরিবেশ এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট হুমকির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
গ্রিনপিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তলদেশ-ঘেঁষা ট্রলার ও ড্রেজারগুলো যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকাগুলোর মোট ৫৫ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রতল ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই আয়তন ডার্টমুর জাতীয় উদ্যানের আয়তনের প্রায় ৫৮ গুণ।
সংগঠনটির মতে, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় মাছ ধরার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা না হলে সামুদ্রিক প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল রক্ষার উদ্যোগ ব্যাহত হবে। তাই এসব এলাকায় কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: