• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার

৫০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করেছে ভারত, তবু কেন বাড়ছে বৈষম্য?

প্রকাশিত: ২০:৪০, ৪ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২০:৪১, ৪ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
৫০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করেছে ভারত, তবু কেন বাড়ছে বৈষম্য?

দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণের ফলে গত ১২ বছরে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। তবে দারিদ্র্য কমানোর এই সাফল্যের পাশাপাশি আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে, আর কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বসবাস। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ৩ ডলারের কম আয়ে জীবনযাপনকারী মানুষের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের নিচে আয় করা মানুষের হার ২০১১ সালের ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এ হিসাবে প্রায় ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক দারিদ্র্য অর্থনীতিবিদ আয়াগো ওয়াম্বিলে ও তার সহলেখকদের পূর্বাভাস, ভারতে দারিদ্র্য কমার ধারা অব্যাহত থাকলেও এর গতি ধীর হতে পারে। তাদের হিসাবে, দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার ২০২৬ সালের ১৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ সালে ১২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ—বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান—এবং খাদ্য ভর্তুকিসহ সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ভারতে দারিদ্র্য কমার প্রবণতা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর। এরপর কয়েক দশক ধরে দেশটিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো দারিদ্র্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানমূলক নানা কর্মসূচি চালু ও সম্প্রসারণ করেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকার গ্রামীণ এলাকায় বছরে অন্তত ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিয়ে একটি কর্মসূচি চালু করে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার সরাসরি নগদ সহায়তা, বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ ও আবাসনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু বা সম্প্রসারণ করে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সরকারি কর্মসূচির আওতায় বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য পান।

মোদি সরকারের আমলে গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহও বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে গ্রামীণ পরিবারের ১৭ শতাংশেরও কম পাইপলাইনের পানির সুবিধা পেত। বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় ৮২ শতাংশ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিরাপদ পানির সুবিধা বাড়লে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমতে পারে। এতে মানুষের কর্মক্ষমতা ও পারিবারিক আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং এ সহায়তা মানুষের পুষ্টির চাহিদা কতটা পূরণ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য সত্ত্বেও ভারতে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির শীর্ষ ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ রয়েছে। বিপরীতে, নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগে রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শীর্ষ ১০ শতাংশ কর্মীর মধ্যম আয়ের পরিমাণ ছিল নিচের ১০ শতাংশ কর্মীর তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। ফলে উচ্চ আয়ের মানুষের সম্পদ বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি তুলনামূলক ধীর হতে পারে।

ভারতের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বিপুল জনসংখ্যার কারণে দেশটিতে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যাও এখনো বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাঁর মতে, দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য ভারতের নিজস্ব দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা সুরজিৎ ভাল্লা বিশ্বব্যাংকের হিসাবের পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষজ্ঞ ও সরকারের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়।

অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষের মতে, ভারতের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো অর্থসংকট ও অতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছে। চিকিৎসার খরচও অনেক পরিবারকে দারিদ্র্য বা ঋণের দিকে ঠেলে দেয়।

দারিদ্র্য কমলেও কর্মসংস্থানের অভাব ও আয়বৈষম্য ভারতের তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে তরুণদের বেকারত্বের হার ২০২৫ সালের এপ্রিলে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ১৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়।

বেঙ্গালুরুভিত্তিক আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ২০ শতাংশ বেকার। ডিপ্লোমা বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদ নীতিন কুমার ভারতী বলেছেন, চরম দারিদ্র্য কমার অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক হলেও একে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে এখনো ২৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ রয়েছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহার মতে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে ভারতে আরও প্রগতিশীল করব্যবস্থা চালু এবং সর্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে সামাজিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি বৈষম্য কমানোও সহজ হবে।

নীতিন কুমার ভারতী বলেন, দারিদ্র্য কমাতে একাধিক নীতির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, গ্রাম থেকে শহরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ চীনের দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ায়। তবে একই সঙ্গে মানসম্মত সরকারি বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে দরিদ্র মানুষও উন্নয়নের সুফল পেতে পারে। এ জন্য প্রগতিশীল করব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। তবে এ অগ্রগতিকে টেকসই করতে শুধু চরম দারিদ্র্য কমানোই যথেষ্ট নয়। আয়বৈষম্য হ্রাস, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আলজাজিরা

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত