যে পাঁচ কারণে শোচনীয়ভাবে হারলো রিপাবলিকানরা
ছবি: ইন্টারনেট
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ, ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচার, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ফলাফলকে ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের প্রতি ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে আসন হারাতে হয়। তবে, এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতা দলটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠেছে। ভোটারদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক চাপ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষ—সব মিলিয়ে এই পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১. জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী
যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভুগেছেন ভোটাররা। গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে নির্বাচনী প্রচারের সময় তাদের ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বাচনের আগে বিবিসিকে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, “পেট্রলের দাম, মুদিপণ্যের দাম- সবকিছুরই দাম বাড়ছে।” এ কারণে এবারের নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকানদের ছেড়ে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশটিতে খুচরা পর্যায়ে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৬ দশমিক ৫২ ডলার, যা রেকর্ডের কাছাকাছি।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ (৭৯ শতাংশ) ভোটার মনে করেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি তাদের বা তাদের পরিবারের জন্য গুরুতর কিংবা মাঝারি ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করেছে। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়েছে।
২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় একটি কারণ ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে পেট্রল পাম্পে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিনির কাছেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকদের কাছেও এটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে সরে আসার মতো বিষয়। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো যুদ্ধে জড়ানো হবে না।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভুল ছিল। অন্য একটি জরিপে ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিংবা বড় একটি বিবেচ্য বিষয়।
নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্প স্বীকার করেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচার
ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে ছিল শক্তিশালী প্রার্থী এবং সুসংগঠিত নির্বাচনী প্রচার। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজেদের বক্তব্য ও অবস্থানের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার- এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার চালিয়েছেন।
সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো এবং যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন যথাক্রমে টেক্সাস ও কানসাসে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় বড় ধরনের চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। শিশু চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা অ্যান্ড্রুজ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এমন এক দেশে তার এই বক্তব্য ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, যেখানে অনেকেই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর বলে মনে করেন। মিশিগানে জয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটদের আসন ধরে রেখেছেন সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সায়েদ। তার প্রচারের অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘রাজনীতি থেকে অর্থ সরিয়ে মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানো’।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। ৩৯ বছর বয়সী অসফ এমন একটি অঙ্গরাজ্যে স্বচ্ছন্দ জয় পেয়েছেন, যেখানে ট্রাম্প দুবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছিলেন। তার এই জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও বাড়াবে। এমনকি ট্রাম্পও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ‘ভালো কাজ করেছে’।
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্বল প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ভোটারদের উদ্বেগ ও চাহিদাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় তাদের প্রচার কার্যক্রম সমালোচিত হয়েছে।
৪. ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা ডুবিয়েছে রিপাবলিকানদের
ভোটারদের সবচেয়ে বেশি অসন্তোষের দুটি বিষয়- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইরান যুদ্ধ- সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে এসব ইস্যুতে ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপরও। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমে গিয়েছিল। ফলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে ভাবতে বলেছিলেন, যেন নির্বাচনে তার নিজের নামই ব্যালটে রয়েছে। তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকার পর এবারের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক আকর্ষণ হয়তো আগের মতো কাজ করছে না। জনগণের ক্ষোভ যখন বাড়ছিল, তখন রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে রাখার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তা উল্টো ফল দিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগের কয়েক মাসের বিভিন্ন জরিপে দেখা গিয়েছিল, অনেক মার্কিনি চান, ট্রাম্প যেন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো তাদের বাস্তব সমস্যাগুলোতে আরও বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে নির্বাচনী প্রচারের শেষ ভাষণে ট্রাম্প তার পেছনে থাকা ‘রিফ্লেক্টিং পুল’ সংস্কার প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। প্রকল্পটি নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক ছিল।
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের অবস্থান পরিবর্তন
দুই বছর আগে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের রিপাবলিকানদের প্রতি ঝোঁক ট্রাম্পকে বড় জয় পেতে সহায়তা করেছিল। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতা উল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক-অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক-অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি কমেছে। দেশটির বড় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমটির তথ্য বিশ্লেষক জেফ অ্যাডেলসন।
অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ আইসিই সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচনের লড়াই এখনো হাড্ডাহাড্ডি। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের অনুপাত সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৩৭ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর মিসিসিপি থেকে প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়বেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: