এবার ফ্রান্সের ব্লাড ব্যাংকে সাইবার হামলা চালালো হ্যাকাররা!
ছবি: ইউরো নিউজ
ইউরোপজুড়ে সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারে সাইবার হামলার ঘটনার মধ্যে এবার ফ্রান্সের রক্ত সংরক্ষণাগারে (ব্লাড ব্যাংক) হামলার ঘটনা ঘটেছে। হ্যাকাররা দেশটির জাতীয় রক্ত সঞ্চালন সংস্থার অধীনে থাকা তিনটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবে সতর্কসংকেত পেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় সংরক্ষিত রক্তজাত পণ্যের ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের জাতীয় রক্ত সঞ্চালন সংস্থা (ইএফএস) জানায়, সোমবার (৩ নভেম্বর) স্থানীয় সময় রাতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হ্যাকাররা সংরক্ষণাগারগুলোর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বরফ গলানোর নির্ধারিত সীমা ‘অত্যন্ত উচ্চমাত্রায়’ বাড়িয়ে দেয়। তবে অ্যালার্ম ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি শনাক্ত হওয়ায় প্রযুক্তিবিদেরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হন।
ইএফএস ফ্রান্সের সরকারি রক্ত সঞ্চালন সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে ১ হাজার ৯০০টির বেশি হাসপাতালে রক্ত, প্লাজমা ও প্লেটলেট সংগ্রহ, পরীক্ষা, প্রস্তুত এবং সরবরাহ করে। প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি রোগীকে সেবা দেয় সংস্থাটি।
ফ্রান্সের রক্ত সংরক্ষণাগারে হামলার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটলো, যখন ইউরোপের প্রায় এক ডজন দেশের সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে কয়েক মিলিয়ন ইউরো মূল্যের খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়েছে।
মঙ্গলবার ইতালি, জার্মানি, রোমানিয়া ও যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো এ হামলার শিকার হয়। এর আগের দিন বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সমস্যার খবর পাওয়া যায়।
গত মাসেও ফ্রান্সে ধারাবাহিক সাইবার হামলায় প্রায় ৭০০ সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল হ্যাকাররা। বুধবার ফ্রান্সের ক্রেডিট মিউচুয়েল ব্যাংকের একটি আঞ্চলিক শাখাও সাইবার হামলার শিকার হওয়ার কথা জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আগস্টের শুরুতে দেশটির অন্তত ছয়টি সামরিক ঘাঁটির পণ্য সরবরাহকেন্দ্রে রহস্যজনকভাবে একের পর এক ফ্রিজ বিকল হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিষয়টি তদন্ত করছে পেন্টাগন।
মঙ্গলবার ইতালি সরকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মুখপাত্র টমাস রেনিয়ের জানান, এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে জোটটির বিভিন্ন সংস্থা জাতীয় কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে জরুরি আলোচনা করছে।
তিনি বলেন, “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ ধরনের সাইবার হামলা মোকাবিলায় আমাদের সম্মিলিতভাবে প্রস্তুত ও সহনশীল থাকতে হবে।” তবে হামলার পেছনে কারা রয়েছে, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। হামলার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয় এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এর দায় স্বীকার করেনি।
বাণিজ্যিক শীতলীকরণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন যন্ত্র এখন দূর থেকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এসব যন্ত্রের ইন্টারনেট-সংযুক্ত সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়মিত হালনাগাদের মাধ্যমে দূর করা না হলে হ্যাকাররা সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের সমন্বিত ও প্রচলিত যুদ্ধের বাইরের হামলার আশঙ্কা বেড়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, ইউরোপে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে মস্কো। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের হুমকি বিশ্লেষণ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক রাফে পিলিং দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, হামলার সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন ও সংকেত দেওয়া, অথবা কোনো একক হ্যাকারের কর্মকাণ্ড।
ইএফএস জানিয়েছে, সংস্থাটিকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি। তাদের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত শীতলীকরণ সংরক্ষণাগারগুলোতে হামলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষগুলোতে রাখা রক্ত সঞ্চালনের জন্য ব্যবহৃত প্লাজমার ব্যাগ ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদানসহ বিভিন্ন পণ্য অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ফ্রান্সের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (এএনএসএসআই) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাদের সব যন্ত্রপাতির ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: