যেভাবে বড় ব্যবধানে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় পেলো ডেমোক্র্যাটরা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। কানসাস, টেক্সাস ও মিসিসিপির মতো রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তোষ, দেশজুড়ে দলীয় সংগঠন বিস্তার এবং স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় প্রার্থীদের সামনে আনার কৌশল—সব মিলিয়ে এই সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
দীর্ঘদিন ধরে যেসব আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হতো, সেসব জায়গাতেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। সেই কৌশল কতটা কার্যকর হয়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ মিসিসিপি ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়।
তবে এই সাফল্য কেবল বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল, নাকি ভবিষ্যতের নির্বাচনেও কাজে লাগানোর মতো নতুন কৌশল খুঁজে পেয়েছে দলটি—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মিসিসিপি। চার বছর আগে জর্জিয়ায় সিনেটের দুটি আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ভূমিকা রাখার পর এবার দলের নির্বাচনী পরিসর আরও বাড়াতে নতুন প্রার্থী খুঁজছিলেন সিনেটে সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমার। শেষ পর্যন্ত তার নজর পড়ে মিসিসিপির দিকে।
সেখানে পাবলিক প্রসিকিউটর স্কট কলোমকে সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী করার উদ্যোগ নেন তিনি। ২০২৩ সালে মিসিসিপির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ফেডারেল বিচারক হওয়ার পথে বাধার মুখে পড়েছিলেন কলোম। ওই সময় তার মনোনয়ন আটকে দিয়েছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর সিন্ডি হাইড-স্মিথ। পরে সেই সিনেটরের বিরুদ্ধেই কলোমকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান শুমার।
কলোমকে প্রার্থী করতে এতটাই আগ্রহী ছিলেন শুমার যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে ও তার বাবাকে একসঙ্গে নাশতার আমন্ত্রণ জানান। সংবাদমাধ্যম এমএস নাউকে শুমার বলেন, তিনি কলোমকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জোর দিয়েছিলেন।
দুই বছর পর সেই প্রচেষ্টার ফল মিলেছে। সর্বশেষ গণনায় প্রায় দুই হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন কলোম। এই ব্যবধান ধরে রাখতে পারলে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন যুগের পর মিসিসিপি থেকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সিনেটর হবেন তিনি।
শুক্রবার সাংবাদিকদের কলোম বলেন, জাতীয় পর্যায়ে মিসিসিপিকে বরাবরই উপেক্ষা করা হয়েছে কিংবা পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, এই নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনবে।
ডেমোক্র্যাটদের এবারের নির্বাচনী পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি ছিল সারা দেশে দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা। প্রচলিতভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে বেশি অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তি ব্যয় না করে দেশজুড়ে দলীয় কার্যক্রম বিস্তারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ভাইস চেয়ার জেন ক্লিব বলেন, দলটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বিনিয়োগ করবে, নাকি সারা দেশের ৫৭টি অঙ্গরাজ্য ও আঞ্চলিক সংগঠনে বিনিয়োগ করে বছরজুড়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেবে—এমন প্রশ্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন সর্বত্র জয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে।
কিছু আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা এতটাই কম বলে মনে করা হয়েছিল যে জাতীয় পর্যায়ের নেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেননি। কিন্তু নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর সেই নেতাদেরই প্রার্থীদের ফোন নম্বর খুঁজতে হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপে দেখা যায়, অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের সমর্থন ধীরে ধীরে দলটির দিকে ঝুঁকছে। কৌশলবিদদের মতে, বিদেশি পণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক এবং ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়। এতে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আত্মবিশ্বাস পায় ডেমোক্র্যাটরা।
বছর যত গড়িয়েছে, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে তার সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু সেই বিষয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অন্য কাজে মনোযোগ দিচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে এবং জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ হিসেবে দেখে ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের নির্মাণকাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং নির্বাচনী পরাজয়ের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ভোটাররা কী অনুভব করছেন, তা স্বীকার করা এত কঠিন কেন?
ডেমোক্র্যাট নেতারা মনে করেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মতো এবারও শুধু তাকে লক্ষ্য করে নির্বাচনী প্রচার চালানো ঠিক হতো না। তাই প্রার্থীদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও প্রস্তাব তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়। ভোটারদের বোঝাতে বলা হয়, তারা নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে কী করতে পারবেন।
এর প্রভাব দেখা গেছে উত্তর ক্যারোলাইনায়। রিপাবলিকানরা সেখানে প্রতিনিধি পরিষদের ১৪টি আসনের মধ্যে ১১টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষে বড় ব্যবধানে ভোট পড়া এলাকাগুলোতেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে ১৪টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জয় পাওয়ার পথে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তিনজন ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ও নির্বাচনী কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আসনের কয়েকটিতে জয়ের সম্ভাবনা কম মনে করায় জাতীয় পর্যায়ের দলীয় নেতারা প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করেননি। অর্থের দিক থেকেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন।
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক সংকটকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখা।
দলীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ডেমোক্র্যাট নেতারা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা ছিল—দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে যেন মনোযোগ সরে না যায়।
এর আগে রিপাবলিকানদের সমর্থনে সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা খাতের ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ বিষয়টিও নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগান ডেমোক্র্যাটরা।
কানসাসে ডেমোক্র্যাটদের জয় ছিল এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় চমক। ১৯৩২ সালের পর অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি দলটি। এবার অ্যাডাম হ্যামিলটন সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন।
হ্যামিলটন এপ্রিলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রচারের শেষ কয়েক সপ্তাহের আগে জাতীয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাট নেতারা তাঁর নির্বাচনী প্রচারে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বলে জানিয়েছেন তার প্রচার উপদেষ্টা গাই সিসিল।
সিসিল বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে নিজেদের সম্ভাবনার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শালীনতা ফিরিয়ে আনা এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়েও হ্যামিলটন কথা বলেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের এবারের জয় তাই শুধু রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভের প্রতিফলন নয়; বরং নতুন এলাকায় সংগঠন গড়ে তোলা, স্থানীয় প্রার্থীকে গুরুত্ব দেওয়া এবং মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটকে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রাখার সম্মিলিত ফল। এখন দেখার বিষয়, এই কৌশল ভবিষ্যতের নির্বাচনেও ধরে রাখতে পারে কি না দলটি।
সূত্র: রয়টার্স
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: