নেতানিয়াহুর পতনের কাউন্টডাউন? ক্ষমতা হারালেই কারাগারের ঝুঁকি!
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একের পর এক রাজনৈতিক সংকট সামলে, বারবার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় ফিরেছেন তিনি। তবে এবারে তার সেই ক্ষমতার ভিতেই ধাক্কা লেগেছে। ইসরাইলে নতুন সরকার গঠনে সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের মধ্যপন্থী চার দলের জোট পেয়েছে ৪৮টি। আরব নেতৃত্বাধীন দুটি জোট পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইজেনকটকে প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সরকার গঠনে তিনি প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৪২ দিনের মধ্যে তাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকারকে নেসেটে আস্থা ভোটে জিততে হলে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন।
কিন্তু এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনই আইজেনকটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার জোটের ৪৮ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যুক্ত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা অ্যাভিগদার লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনের বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সমর্থন পেতে হলে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের ছাড় দেওয়ার মতো বিষয়ে সমঝোতা করতে হবে। তিনি এসব বাধার সুরাহা করে সরকার গঠনে সমর্থ হবেন বলেই মনে করছেন অধিকাংশ পর্যবেক্ষক।
এ অবস্থায় ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়লে নেতানিয়াহুর পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। নেতানিয়াহুর জন্য ক্ষমতা হারানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো চলমান দুর্নীতির মামলা। ইসরায়েলের তার বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ২০২০ সাল থেকে বিচার চলছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ হারালে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন করে গতি পাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আছে কারাদণ্ডের ঝুঁকি।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন উঠেছে, সেটিও নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হলে ওই সময়ের নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তের দাবি আরও জোরালো হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, গাজা নীতি এবং সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও তদন্ত শুরুর ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীত্ব হারালে সেটি মোকাবেলায় নেতানিয়াহুর ক্ষমতাও ব্যাপক লোপ পাবে।
তবে আইজেনকট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর সামনে আবারও আস্তে পারে সুবর্ণ সুযোগ। কারণ, প্রথম প্রার্থী ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু নতুন করে সরকার গঠনের চেষ্টা চালাতে পারেন।
সেই লক্ষ্য পূরণে বিরোধী জোটের সদস্যদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন নেতানিয়াহু। বিরোধীদের মধ্য থেকে কয়েক আইনপ্রণেতাকে নিজের পক্ষে আনতে পারলে তার ৫৩ আসনের জোটের শক্তি বাড়বে। অতীতেও প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সদস্যদের সমর্থন আদায় করে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর নজির রয়েছে নেতানিয়াহুর।
এ ছাড়া জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে আইজেনকট নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে আইজেনকট এবং পরবর্তী মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় একজনকে মনোনীত করতে পারবেন। সেই প্রার্থীও ব্যর্থ হলে দেশটিতে নতুন নির্বাচনের পথ খুলে যাবে। আর সেখানেও নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকবে। তবে নতুন নির্বাচনে কী ফল আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বিভি/এইচজে













মন্তব্য করুন: