যে এক অভ্যাসে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
রাতে ঘুমানোর সময় ঘরে সামান্য আলো জ্বালিয়ে রাখার অভ্যাসও হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে আলোর সংস্পর্শ যত বেশি, হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতায় সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্কও তত বেশি।
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের ১১ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, প্রায় অন্ধকার ঘরে ঘুমানো ব্যক্তিদের তুলনায় রাতে বেশি আলোতে থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্যন্ত্রের দেয়াল কিছুটা মোটা এবং বাঁ নিলয়ের ভর কিছুটা বেশি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের সংকোচনক্ষমতাও কিছুটা কম ছিল। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে।
সামান্য আলোও কি প্রভাব ফেলতে পারে?
গবেষণায় রাতে ৩ লাক্সের বেশি আলোর সংস্পর্শকে আলাদা করে বিবেচনা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকা অংশগ্রহণকারীরা প্রতি রাতে গড়ে প্রায় ৩৪ মিনিট ৩ লাক্সের বেশি আলোতে ছিলেন। এই মাত্রার আলোকে মোটামুটি বিছানা থেকে প্রায় এক মিটার দূরে তিনটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
যাঁরা রাতে সবচেয়ে বেশি আলোতে ছিলেন, তাঁদের তুলনায় প্রায় অন্ধকারে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের বাঁ নিলয়ের ভর ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, গড় দেয়ালের পুরুত্ব ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং হৃদ্যন্ত্রের সংকোচনক্ষমতার একটি পরিমাপ প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ভাষায়, এসব পরিবর্তন ‘কার্ডিয়াক রিমডেলিং’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি চাপ বা ক্ষতির প্রতিক্রিয়ায় হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতায় যে পরিবর্তন হতে পারে, তার কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ এখানে দেখা গেছে।
৭৩ হাজার মানুষের তথ্যেও সম্পর্ক
গবেষকেরা আরও বড় একটি বিশ্লেষণে ৭৩ হাজার ২৮৬ জনের তথ্য পরীক্ষা করেন। ৮ থেকে ১০ বছরের পর্যবেক্ষণে রাতে সবচেয়ে বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
এই দলের ক্ষেত্রে হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের ঝুঁকি ১৫ শতাংশ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের ঝুঁকি ২৪ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ বেশি ছিল। হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও ২৬ শতাংশ বেশি দেখা গেছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান থেকে রাতে আলোই এসব রোগের সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং আলো, ঘুম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে।
ঘুম কমে যাওয়ার ভূমিকা
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এক সপ্তাহ ধরে হাতে পরা আলোকসংবেদী যন্ত্রের মাধ্যমে আলোর সংস্পর্শ মাপা হয়। প্রায় তিন বছর পর তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা কার্ডিওভাসকুলার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স বা সিএমআর প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা মনে করছেন, রাতে আলো হৃদ্যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার পেছনে ঘুম কমে যাওয়ার ভূমিকা থাকতে পারে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম ঘুম গবেষণায় পাওয়া কিছু পরিবর্তনের প্রায় ২৪ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পারে।
রাতে আলো মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমাতে পারে। মেলাটোনিন শরীরের ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাতে আলোর সংস্পর্শ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে পরোক্ষভাবে হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
ঘুমের ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখুন
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, রাতে ঘুমানোর সময় অপ্রয়োজনীয় আলোর সংস্পর্শ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা উপকারী হতে পারে। ঘরে বাইরের আলো ঢুকলে পর্দা ব্যবহার করা কিংবা প্রয়োজন হলে চোখের মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে গবেষকেরা নিজেরাও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কারণ-প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও সরাসরি গবেষণা প্রয়োজন। অর্থাৎ রাতে আলো কমানো হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করবে—এমন নিশ্চয়তা এই গবেষণা দেয়নি। বরং এতে রাতে আলোর সংস্পর্শ, ঘুম এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সূত্র: ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল, সায়েন্স অ্যালার্ট
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: