ওএমএস এর চাল-আটা বিক্রির বরাদ্দ হ্রাসে খানির উদ্বেগ প্রকাশ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খোলাবাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচিতে চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক -খানি উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে চলতি অর্থবছরে ওএমএসে চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আটা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টন চাল ও ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন আটা।
অর্থাৎ চাল প্রায় ২১ শতাংশ এবং আটা প্রায় ২২ শতাংশ কমছে, সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টন। ওএমএসের ভর্তুকি বরাদ্দ ৪ হাজার ৯৬ কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকায় নামানো হয়েছে, যা প্রায় ১৭ শতাংশ কম। .২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্য খাতে মোট ভর্তুকি ৭ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা করা হয়েছে যা এর আগের বছর ছিলো ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।
ওএমএস মূলত শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিচালিত, এবং শহরের দরিদ্রদের জন্য প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংখ্যা সীমিত। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী, নগরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০১০ সালের ৭৪ লাখ থেকে ২০২২ সালে ৭৯ লাখে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। দেশের অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায় না; শহরে এই হার প্রায় ৬৪ শতাংশ।
গতকাল ১৭ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দারিদ্রতার চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে শহরাঞ্চলের ৪০.১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২.১১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩,৫১৩ টাকা, যেখানে গড় ব্যয় ৩৫,৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় গড় মাসিক ব্যয় সর্বোচ্চ, ৪৬,৭৭৮ টাকা। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ; আবাসন ও ইউটিলিটিতে ৯.৮১ শতাংশ এবং পরিবহনে ৯.৪৬ শতাংশ।
ওএমএসে চালের দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা, যেখানে বাজারে মোটা চাল ৫০–৫৫ টাকা এবং মাঝারি চাল ৫৬–৬৫ টাকা। ওএমএসের সুবিধা না পেলে একটি পরিবারকে কেজিপ্রতি অন্তত ২০–২৫ টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে। কমানো ৬৪ হাজার টন চালের হিসাবে উপকারভোগী পরিবারগুলোর সম্মিলিত বাড়তি ব্যয় আনুমানিক ১২৮–১৬০ কোটি টাকা; আটা বিবেচনায় নিলে তা আরও বেশি।
এর ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্যের পরিমাণ বা পুষ্টিমান কমাতে হতে পারে, যা শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে। খাদ্যে বাড়তি ব্যয় মেটাতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো বা ঋণনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ ছাড়া ওএমএস বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। গত এক সপ্তাহে রাজধানীতে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে; এ সময়ে সরকারি সরবরাহ কমলে বাজারে মূল্যচাপ বাড়তে পারে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওএমএস বরাদ্দের সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত নয় এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত বরাদ্দের তহবিল রয়েছে। খানি এই অবস্থানকে স্বাগত জানায় এবং মনে করে, বর্তমান মূল্য পরিস্থিতিতে সেই প্রয়োজন ইতোমধ্যে বিদ্যমান।
খানির সুপারিশ
১. ওএমএসে চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ও ভর্তুকি বরাদ্দ অন্তত গত অর্থবছরের পর্যায়ে বহাল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় তা সমন্বয় করা।
২. সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে, বিশেষত বস্তি ও শ্রমিক-অধ্যুষিত এলাকায়, ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো।
৩. ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার করা।
৪. শহরের দরিদ্র, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট নগর সামাজিক সুরক্ষা কৌশল প্রণয়ন এবং একটি সমন্বিত, অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া।
খানি বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। অর্থনৈতিক ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। তাই খাদ্য সুরক্ষা কর্মসূচি কমানো নয়, বরং আরও শক্তিশালী করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খানি বাংলাদেশ সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিভি/কেএস/এজেড













মন্তব্য করুন: