• বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২ | ৭ মাঘ ১৪২৮

BVNEWS24 || বিভিনিউজ২৪

থার্টিফার্স্ট উদযাপনে ঢাকার আকাশে শত কোটি টাকার ধোঁয়া! 

সাদ্দাম হোসাইন

প্রকাশিত: ২৩:০৫, ৩ জানুয়ারি ২০২২

আপডেট: ১৪:৩৭, ৪ জানুয়ারি ২০২২

ফন্ট সাইজ
থার্টিফার্স্ট উদযাপনে ঢাকার আকাশে শত কোটি টাকার ধোঁয়া! 

ইংরেজি নতুন বছরকে বরণ করতে উৎসবে আতশবাজি ফুটানো, পোড়ানো এবং ফানুস উড়ানো নিষিদ্ধ করেছিলো ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। উন্মুক্ত স্থানসহ বাসা-বাড়ির ছাদেও এমন আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। কিন্তু মানা হয়নি সেই নিষেধাজ্ঞা।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, থার্টিফার্স্ট উদযাপনে রাজধানীসহ দেশে নিষিদ্ধ-আনন্দে আকাশে ধোঁয়া হয়ে উড়েছে অন্তত শত কোটি টাকারও বেশি। আতশবাজি বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় এমন ধারণা মিলেছে। প্রশ্ন হলো, যেখানে আতশবাজি কেনা-বেচা, সরবরাহ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ, সেখানে এক রাতেই দেশের আকাশে শত কোটি টাকার আতশবাজি ফুটলো কীভাবে? 

বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪ অনুযায়ী- দেশে আতশ আমদানি, এর ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও মজুদ করা অপরাধ; যা নজরদারির দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদফতরের। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, ‘আতশবাজি ব্যবহার কিংবা কেনা-বেচার অনুমোদন নেই। কেউ এটি আমদানি বা ব্যবহার করতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হবে। জানা মতে, সেই অনুমতিও কেউ নেননি। আমার ধারণা, এগুলো চোরাই পথে দেশে ঢুকেছে। এই প্রবেশাধিকার ঠেকোনার ক্ষমতা আমাদের নেই। এটি দেখেবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

থার্টিফার্স্টে আতশবাজির চোখ-ধাঁধানো দৃশ্যে হতবাক জনাব আজাদ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বয়স্ক, অসুস্থদের কী অবস্থা হয়েছে? শিশুদের কথা ভাবুন। তিনি বলেন, গোয়েন্দারা চাইলেই এগুলো কেনা-বেচা, ব্যবহার ও মজুদ বন্ধ করা সম্ভব। 

সদ্য বিদায়ী বছরের শেষ রাতে বাহারি আতশবাজির পাশাপাশি আকাশে উড়েছে নানান রঙের ফানুসও। দীর্ঘ সময় আকাশে উড়তে থাকা এসব ফানুস এবং বিকট শব্দে ফুটতে থাকা পটকা ও আতশবাজি রাজধানীকে যতোটা না বর্ণিল আলোয় রাঙিয়েছে, ততোধিক আতংক ও বিপদ সৃষ্টি করেছে।

নিষিদ্ধ এই উদযাপনে পটকা ও আতশবাজির শব্দ মানুষের কানে তালা তো লাগিয়েছেই, ফানুসের আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে অনেকের শেষ সম্বলটুকুও। জানা গেছে, এদিন কেবল ফানুস থেকেই আগুন লেগেছে রাজধানীসহ দেশের দুই শতাধিক স্থানে। 

এর মধ্যেই কপাল খুলেছে অনেকের। এদেরই একজন মো. বেলাল হোসেন। মাঝবয়েসি বেলাল ভ্যানগাড়ি নিয়ে কখনও সবজি, কখনও জুতা বা মৌসুমী ফল বিক্রি করেন। রাজধানীর মিরপুরের অলিগলি ঘুরে এই ব্যবসার লাভ দিয়ে টেনেটুনে চলে দুই সন্তান, স্ত্রী এবং বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে বেলালের সংসার। সেই বেলালই গত ২৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত চারদিনে আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন। মাত্র ২০ হাজার টাকার আতশবাজি কিনে বিক্রি করেছেন ১ লাখ ১০ হাজার টাকায়। 

বাংলাভিশন ডিজিটালকে বেলাল জানান, অন্য এক হকারের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুরান ঢাকার শাখারি বাজার থেকে প্রথমে ৫ হাজার টাকার আতশবাজি কিনে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে পরদিন আরও ১৫ হাজার টাকার আতশবাজি কেনেন। সব মিলিয়ে হাতে এসেছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এমন অসংখ্য বেলাল নিষিদ্ধ আতশ বিক্রি করে কয়েকগুণ লাভবান হয়েছেন। 

 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আতশবাজি পোড়ানো, পটকা ফুটানো এবং ফানুস উড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। উল্টো অসহায়ত্ব প্রকাশ করে থার্টিফার্স্ট রাতে গুলশান-২-এ এক ব্রিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘আতশবাজি থামানোর বিষয় না। হাত দিয়ে আটকে রাখা যায় না। আতশবাজি-পটকা ফুটায় টিনেজ ছেলে-মেয়েরা। বেশি বিধি-নিষেধ দিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করা ডিফিকাল্ট। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে নিষেধ করতে পারবো না।’

মজার বিষয়, কমিশনার যখন গণমাধ্যমের সামনে কথা বলছিলেন, তাঁর আশেপাশেই ফুটছিলো একের পর এক পটকা ও পুড়ছিলো আতশবাজি। 

বেলাল হোসেন-এর দেওয়া তথ্যমতে, আতশবাজি বিক্রির এমন দোকানের সন্ধানে পুরান ঢাকার চকবাজার, তাঁতীবাজার ও শাখারিবাজার এলাকায় অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, উল্লিখিত এলাকাগুলোতে কেউই প্রকাশ্যে আতশ বিক্রি করছেন না। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী অবৈধ উপায়ে কুমিল্লা, নরসিংদী ও সিলেট সীমান্ত দিয়ে এসব নিষিদ্ধ সামগ্রী ঢাকায় আনছেন। 

প্রকাশ্যে পটকা ও আতশবাজির সামগ্রী বিক্রেতার সন্ধান না পেলেও স্থানীয় একজনের সহায়তায় নাম গোপন রাখার শর্তে একজন ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে জানান, থার্টিফার্স্টের আগেই তিনি ৫৫ লাখ টাকার আতশ বিক্রি করেছেন। তাঁর কাছে অবশিষ্ট নেই। খুব প্রয়োজন হলে অন্যত্র থেকে ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, তাঁর পরিচিত তিন ব্যবসায়ী আড়াইশ’ কোটি টাকার আতশ বিক্রি করেছেন এবার। 

নিষিদ্ধ এসব সামগ্রীর নাম এবং দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কালার আতশ প্রতিটি ২ থেকে ১০ হাজার টাকা; যা ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত আকাশে দেখা যায়। মাল্টিকালার আতশ ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এগুলো আকাশে বড় হয়ে ফোটে। পুলিশের ভয়ে একেকজন একেক নামে এগুলো বিক্রি করেন। যেমন- কমান্ডো, হাইড্রো ফয়েলস, ফোয়ারা ইত্যাদি।

মুখে মুখে হিসাব কষে তিনি বলেন, পুরান ঢাকার প্রতিটি বাসায় কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার টাকার আতশবাজি ফুটানো হয়। সেই হিসাবে পুরান ঢাকার প্রায় ২০ হাজার বাড়িতে আতশবাজির পেছনে ব্যয়ের হিসাব কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ঢাকা এবং দেশের হিসাবে এই অংক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, হয়তো তা কেবল মুখে মুখে হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়বে।

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের হাবিবুল ইসলাম সুমন বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, আমাদের এলাকায় সাকরাইন এবং থার্টিফার্স্ট নাইট মানেই আতশবাজি ফুটানো এবং ফানুস উড়ানোর মৌসুম। আমার ঘনিষ্ট দুই বন্ধুর একজন কিনেছে দুই লাখ এবং অন্যজন কিনেছে এক লাখ টাকার আতশ। মাত্র ১৫-২০ মিনিটেই শেষ এতো টাকা। অবশ্য এগুলোকে আমাদের এলাকায় আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 


অনলাইনেও আতশ বিক্রির রমরমা আয়োজনঃ
আড়ালে আবডালে নয়, এবার অনলাইনেও আতশ বিক্রির রমরমা ব্যবসা হয়েছে। থার্টিফার্স্টকে ঘিরে ফেসবুকে ছিলো আতশ বিক্রির নানান অফার। নানান রঙের, ঢঙের আতশবাজির পোস্টার বানিয়ে বাহারি নাম দিয়ে ক্রেতা আকৃষ্ট করতেও দেখা গেছে। তবে বিক্রেতাদের কেউই পরিচয় জানার মতো তথ্য দেয়নি পোস্টে। ইনবক্সে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেই চলেছে এই ব্যবসা। তাই অনলাইনে বিক্রির পরিমাণ এবং টাকার অংক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়নি।

 


নিষিদ্ধ আতশ কীভাবে ছড়িয়ে পড়লোঃ
এই বিষয়ে কথা বলতে সম্মত হননি ঢাকা মহানগর পুলিশের কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের প্রধান বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, থার্টিফার্স্টের পর উর্ধতন মহল থেকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।

 

ফায়ার সার্ভিসের উদ্বেগ প্রকাশঃ
থার্টি ফাস্ট ও নতুন বছর উদযাপনের সময় সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেক বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদস্যদের। এসব আগুনে হতাহত না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালামাল। আতশবাজির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, সচেতন নাগরিকদের উচিত আগুন নিয়ে খেলা না করা। মনে রাখতে হবে, আগুন নিয়ে খেলার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। 

তিনি বলেন, ফানুস ও আতশবাজি উড়াতে হয় খোলামেলা বা নিয়ন্ত্রিত স্থানে। এবার কেউ এই নিয়ম মানেনি। আগুন নিয়ন্ত্রণের আগেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারতো। বিষয়টি মনে রাখা দরকার।

আমরা সক্ষমতা অনুযায়ী চেষ্টা করছি। কিন্তু একই সময়ে একাধিক স্থানে আগুন লাগলে, কিংবা কোনো অগ্নিকান্ড বড় বা ভয়াবহ হলে, তখন কী হতে পারতো? তাই বলবো, আগুন নিয়ে খেলা করবেন না। 

বিভি/রিসি 

মন্তব্য করুন: