তারেক রহমানের চোখধাঁধানো উত্থান, সামনে অর্থনীতি ও কূটনীতির কঠিন পরীক্ষা
ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে বিএনপি, নতুন নেতৃত্বে বড় চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে উঠে এসেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর দলটি সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ—আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা।
আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার: প্রথম অগ্রাধিকার
আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম টাইম তাদের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তারেক রহমানের প্রথম কাজ হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং গত ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ গুমের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আদালত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর দলীয় প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
তারেক রহমান প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির বদলে নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
অর্থনীতি: প্রবৃদ্ধি থেকে চাপের বাস্তবতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০০৬ সালে যেখানে দেশের জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় বৈষম্য ও বেকারত্ব এখন বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। যুব বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত হয়েছে; জ্বালানি ও শিল্পখাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে ৪ কোটির বেশি মানুষ। বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, ব্যাংকখাত সংস্কার এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি: ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ফোকাসে
নতুন সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে পররাষ্ট্রনীতি। বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার কথা বলছে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে সই করে ন্যায্য হিস্যা দাবি করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। সাম্প্রতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনে কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হয়েছে, যা রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই কূটনৈতিক দক্ষতা দেখাতে হবে নতুন নেতৃত্বকে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আগামী সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
হাসিনা আমলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর জামায়াতে ইসলামী আবার সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। যদিও বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও তারা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে।
এনসিপির মতো বিকল্প ধারার দলগুলো এখনো মূলধারায় বড় প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা এবং তরুণ প্রজন্মের আস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সূত্র: টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: