বিশ্বকাপ ফুটবল: উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন!
ছবি: এআই
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও উদ্যাপনের উপলক্ষ। যদিও বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের কোনো দল নেই, তবুও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা অন্যান্য দলের সমর্থনে দেশের শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই তৈরি হয় এক ভিন্ন পরিবেশ। রাস্তাজুড়ে উড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের পতাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে তর্ক-বিতর্ক, আর চায়ের দোকান থেকে অফিস- সবখানেই বিশ্বকাপের আলোচনা মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
ইতিবাচক দিক:
বিশ্বকাপ ঘিরে এই উন্মাদনা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অনন্য দিক। তবে এর যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু নেতিবাচক প্রবণতাও সামনে আসে।
সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, যা সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিশ্বকাপ একটি মৌসুমি বাজার সৃষ্টি করে। পতাকা, জার্সি, খেলাধুলার সামগ্রী, টেলিভিশন, প্রজেক্টর, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলোতে ব্যবসা বেড়ে যায়। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মৌসুমি বিক্রেতার জন্য এটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করে।
একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। শহর থেকে গ্রাম- বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন। ফলে দেশে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
নেতিবাচক দিক:
ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। প্রিয় দলকে সমর্থনের নামে কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপ এবং অসহিষ্ণু আচরণ দেখা যায়। সামান্য খেলার ফল নিয়েও বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন আচরণ খেলাধুলার মূল চেতনার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বকাপকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রদর্শনপ্রিয়তাও আলোচনার দাবি রাখে। অনেক সময় অতি বড় পতাকা টানানো, উচ্চ শব্দে উদ্যাপন কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত খেলা দেখার কারণে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্বকাপের উন্মাদনা যেন বাস্তব জীবনের অগ্রাধিকারকে আড়াল না করে। খেলার আনন্দ অবশ্যই উপভোগ করা উচিত, তবে তা যেন পারিবারিক দায়িত্ব, পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক দায়িত্ববোধকে ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রশ্নবিদ্ধ না করে।
ক্রীড়া মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের বার্তা বহন করে। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলও হওয়া উচিত আনন্দ ভাগাভাগির একটি উপলক্ষ, বিভক্তির নয়। সমর্থন থাকবে, মতভেদও থাকবে; কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো বিদ্বেষে পরিণত না হয়।
আমাদের মনে রাখা উচিত, ফুটবল বিশ্বকাপের আবেগ কয়েক সপ্তাহের; কিন্তু সমাজ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সম্মান দীর্ঘস্থায়ী। তাই বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করাই আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: