শহীদ সাফওয়ানের বোনের চিঠি: ভাইয়া আরেকবার যদি তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম!
৫ আগস্ট ২০২৪। দিনটি ছিল সোমবার। সময় তখন দুপুর ২টা। টিভিতে খবর এলো, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। চারদিকে আনন্দের মিছিলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমরা আর পাশের বাসার আন্টিরা ছাদে গিয়েছিলাম। দূর থেকে মানুষের আনন্দ আর উল্লাসের শব্দ আসছিল। সবাই মিলে ঠিক করলাম, রাতে পিকনিক করব।
রাত প্রায় ৯টা। আম্মু এশার নামাজ পড়ে পাশের বাসার আন্টিদের সঙ্গে রান্না করতে গিয়েছিল। এমন সময় নিচে মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে বুঝলাম, আব্বু এসেছে। আমি আর আমার ছোট ভাই সাহাল দৌড়ে নিচে গেলাম।
তারপর দ্রুত বাসায় উঠে গেল আব্বু। আমি দেখলাম, আব্বু আমার রুমে গিয়ে কাঁদছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে আব্বু? তুমি কাঁদছ কেন?’
আব্বু কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমার সদ্য ভাইয়া পুলিশের গুলিতে মারা গেছে।’
আমি প্রথমে কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এটা কীভাবে সম্ভব? সদ্য ভাইয়া কীভাবে মারা যাবে?
সদ্য ভাইয়া ছিল আমার ছোট ফুপির একমাত্র ছেলে। সে সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণিতে পড়ত। খুব মেধাবী ছিল আমার সদ্য ভাইয়া। আমাদের পরিবারের সবাই তাকে অনেক ভালোবাসত। আমিও তাকে অনেক ভালোবাসতাম।
সদ্য ভাইয়ার খবর শুনে আম্মু আর পাশের বাসার আন্টিরা দৌড়ে এল। আম্মু বাসায় ঢুকেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আব্বু তখন বাড়িতে যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছিল। কিন্তু কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। দেশের পরিস্থিতি খারাপ থাকায় কেউ যেতে রাজি হচ্ছিল না।
অবশেষে ফজরের আজানের পর আমরা রওনা হলাম। যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে অনেক আগুনে পোড়া গাড়ি দেখেছিলাম। চারদিকে কেমন ভয় ভয় লাগছিল। কিন্তু আমার মাথায় তখন শুধু সদ্য ভাইয়ার কথাই বারবার মনে হচ্ছিল—সদ্য ভাইয়া কি সত্যিই আর নেই?
বাড়িতে পৌঁছানোর পর সদ্য ভাইয়ার রক্তে ভেজা মুখটা যখন দেখলাম, তখন আর কান্না থামাতে পারলাম না। আমিও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম।
পুরো বাড়িতে শুধু কান্নার শব্দ। অনেক মানুষ আমাদের বাড়িতে এসেছিল। পুরো এলাকার মানুষ। আমার ফুপি আর আঙ্কেলের কান্না দেখে আমার আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল। সদ্য ভাইয়া যে তাঁদের একমাত্র ছেলে!
সদ্য ভাইয়াকে যখন দাফন করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল, তার বুকে যে গুলিটা লেগেছে, সেই গুলিটা যেন আমার বুকেও লেগেছে।
সদ্য ভাইয়াকে নিয়ে লিখতে গেলে আমার খাতা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমার লেখা শেষ হবে না। তাকে নিয়ে আমার কত কথা, কত স্মৃতি! আমাদের পরিবারের সবাই তাকে খুব ভালোবাসত, খুব আদর করত।
আজ দুই বছর হয়ে গেল, তোমার সঙ্গে দেখা হয় না সদ্য ভাইয়া। তোমার সঙ্গে দুষ্টুমি করা হয় না। তোমাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরা হয় না। আগের মতো যদি আর একবার তোমাকে দেখতে পেতাম! আর একবার যদি দৌড়ে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম!
সদ্য ভাইয়া, তুমি কি আমাদের কথা মনে রেখেছ? আমরা কিন্তু তোমাকে ভুলিনি। আমি তোমাকে অনেক মনে করি। তোমার জন্য আমার বুকভরা দোয়া। মহান আল্লাহ যেন তোমাকে জান্নাতবাসী করেন। পরকালে ভালো থেকো, সদ্য ভাইয়া।
লেখক: জুলাই শহীদ সাফওয়ান আখতার সদ্য এর ছোট বোন ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: