ক্যামেরা নয়, সেদিন দরকার ছিলো একটি হাত
একজন নারী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন সড়কের পাশে। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন, চারপাশে মানুষের ভিড়। তিনি হয়তো সাহায্য চাইছেন, হয়তো কথা বলার মতো শক্তিটুকুও নেই। অথচ তাকে ঘিরে থাকা মানুষের অনেকের হাতে তখন সাহায্যের হাত নয়, উঠে আছে মোবাইল ফোন।
কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার জন্য দৃশ্যটি ধারণ করছেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে আহত মানুষটির প্রয়োজন ছিল না ক্যামেরার; সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একজন মানুষের এগিয়ে আসা।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। কাপ্তাই সড়কের চন্দ্রঘোনা চারা বটতলা এলাকায় দ্রুতগতির একটি অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় আহত হন বীনা নাথ নামের এক নারী। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি সড়কে পড়ে থাকলেও আশপাশে জড়ো হওয়া অনেকেই তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পরে কয়েকজন স্থানীয় নেতা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
ঘটনাটি হয়তো একটি দুর্ঘটনার খবর। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি সামাজিক প্রশ্ন—আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজের দিকে যাচ্ছি, যেখানে বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করার আগে তার ছবি তোলা জরুরি হয়ে উঠছে? চলুন, একটু আলোচনা করে আসি।
মানুষ কেন সাহায্যের বদলে ভিডিও করে?
নিঃসন্দেহে মোবাইল ফোন আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, একই সঙ্গে এটি আমাদের আচরণেও বড় পরিবর্তন এনেছে। কোনো ঘটনা ঘটলেই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে পকেট থেকে দ্রুত মোবাইল ফোন বের করা।
দুর্ঘটনা, মারামারি, আগুন, অসুস্থতা কিংবা মানুষের কান্না—যাই হোক না কেন, সবই যেন এখন ক্যামেরার বিষয়। অপ্রত্যাশিত এসব পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে বা সহযোগিতার হাত বাড়ানোর চেয়ে ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করাই অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মনোবিজ্ঞানে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ বা দর্শক-প্রভাবের ধারণার সম্পর্ক রয়েছে। অনেক মানুষ কোনো বিপদ প্রত্যক্ষ করলে প্রত্যেকে ধরে নিতে পারেন, অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন। ফলে আশপাশে বিপুল মানুষ উপস্থিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাহায্যের হাত বাড়ান না কেউই।
তবে কি দায়িত্ব নেওয়ার ভয় কাজ করে?
বাংলাদেশে দুর্ঘটনায় আহত কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, আইনি ঝামেলা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়ার আশঙ্কাও অনেক মানুষের মধ্যে কাজ করে। ট্রমা রোগীদের নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণের অভাব, আহত ব্যক্তির ক্ষতি আরও বেড়ে যাওয়ার ভয়, অ্যাম্বুলেন্সের সীমিত প্রাপ্যতা এবং পুলিশি ও আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মানুষকে সাহায্য করা থেকে বিরত রাখতে পারে।
অর্থাৎ সমস্যাটিকে শুধু ‘মানুষ নিষ্ঠুর হয়ে গেছে’—এভাবে দেখলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে না। সামাজিক অভ্যাস, সচেতনতার ঘাটতি, প্রশিক্ষণের অভাব এবং নিরাপদভাবে সাহায্য করার ব্যবস্থা না থাকার মতো একাধিক কারণও এখানে কাজ করে।
তাহলে কি ক্যামেরাই সবসময় অপরাধ?
না। একটি দুর্ঘটনার ছবি বা ভিডিও অনেক সময় অপরাধী শনাক্ত করতে, পরিবারের কাছে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় পৌঁছাতে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে সহায়তা করতে পারে। রাঙ্গুনিয়ার ঘটনাতেও আহত নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। তাই সমস্যা ছবি তোলায় নয়; সমস্যা তখনই, যখন ঠিক ওই সময়ে ছবি তোলা সাহায্য করার জায়গাটি দখল করে নেয়।
নৈতিকতার দিক থেকে একজন মানুষ আহত হয়ে পড়ে থাকলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাকে নিরাপদ করা, জরুরি সহায়তা ডাকা এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। এরপর প্রয়োজন হলে ঘটনাটির প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যেতে পারে।
একবার ভেবে দেখুন—একজন মানুষের জীবন আর একটি ভাইরাল ভিডিওর মধ্যে অগ্রাধিকার কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের কাছেই রয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক মিনিট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে ১০ বছরের কার্যক্রমে ৩ হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় প্রায় ৬ হাজার আহত ব্যক্তিকে সেবা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রথম সাড়াদানকারী পাঁচ মিনিট বা তার কম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।
অর্থাৎ, সবাই চিকিৎসক হতে পারবেন না। কিন্তু প্রাথমিকভাবে কী করতে হবে, তা জানা একজন সাধারণ মানুষও জীবন বাঁচানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তাহলে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব কী?
দুর্ঘটনা দেখলে প্রথমেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর সম্ভব হলে দ্রুত জরুরি সেবা বা পুলিশকে খবর দিতে হবে। আহত ব্যক্তি সচেতন থাকলে তার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তবে প্রশিক্ষণ ছাড়া গুরুতর আহত ব্যক্তিকে টেনে তোলা বা অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করানোও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলো প্রশিক্ষিত ও সতর্কভাবে সাহায্য করা।
আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—আহত ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কথা ভাবতে হবে। কারও দুর্দশা যেন অন্যের বিনোদনের উপকরণে পরিণত না হয়, সেদিকেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
সরকারের করণীয় কোথায়?
মানুষকে শুধু ‘মানবিক হোন, মানুষের পাশে দাঁড়ান’ বললেই হবে না। মানবিক আচরণ করার জন্য রাষ্ট্রকেও একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
প্রথমত, দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার পর সাধারণ মানুষ কোথায় ফোন করবেন, সে বিষয়ে দেশব্যাপী জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা আরও দৃশ্যমান করা দরকার।
চতুর্থত, যারা সৎ উদ্দেশ্যে আহত মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের যেন অযথা হয়রানি বা আইনি জটিলতার মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে পরিষ্কার নীতিমালা ও জনসচেতনতা প্রয়োজন।
আর সবচেয়ে বড় কাজটি হতে পারে সামাজিক প্রচারণা। টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, স্কুল, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার—সব জায়গায় একটি সহজ বার্তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে- ‘দুর্ঘটনা দেখলে আগে সাহায্য করুন, পরে ছবি তুলুন।’ এমন একটি চিন্তা ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কোনো উপযুক্ত সংস্থাকে দিতে পারে সরকার।
কেমন সমাজ চাই আমরা?
আজ সড়কে পড়ে থাকা একজন অচেনা নারীকে দেখে আমরা থেমে যাই। কিন্তু থামার পর আমরা কী করি, সেটি কি কখনো ভেবেছি?
মোবাইল ফোন আমাদের হাতে থাকবে। ক্যামেরাও থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তি যেন মানুষের মানবিকতাকে প্রতিস্থাপন না করে, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। কারণ একদিন হয়তো রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষটি আমাদের পরিচিত কেউ হতে পারেন। হতে পারেন আমাদের মা, বোন, স্ত্রী, বাবা কিংবা সন্তান।
সেদিন আমরা নিশ্চয়ই চাইব না, মানুষ চারপাশে দাঁড়িয়ে শুধু ছবি তুলুক। সেদিন আমরা মন থেকেই চাইব, কেউ একজন এগিয়ে আসুক। কেউ একজন বলুক, ‘ভয় পাবেন না, আমরা আছি।’ সড়কে পড়ে থাকা বীনা নাথের ঘটনা তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি আমাদের সামাজিক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া একটি প্রশ্ন—
মানুষ বিপদে পড়লে আমরা দর্শক হব, নাকি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াব?
ছবি হয়তো একটি ঘটনা ধরে রাখতে পারে। কিন্তু সময়মতো বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাতই হয়তো পারে একটি জীবন বাঁচাতে।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: