• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

১৬ বছরের শাসনের বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এক প্রজন্ম

জে আই জাহিদ

প্রকাশিত: ১৮:১৩, ২৫ জুলাই ২০২৬

ফন্ট সাইজ
১৬ বছরের শাসনের বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এক প্রজন্ম

একটি সরকারের মেয়াদ যখন পাঁচ বছর, তখন ১৫ বছর মানে তিনটি পূর্ণ মেয়াদ। কিন্তু, একটি শিশুর জীবনে ১৫ বছর কেবল একটি রাজনৈতিক সময়কাল নয়; এটি তার শৈশব, কৈশোর এবং মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

চলুন একটু পিছনে গিয়ে ভাবা যাক, ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০৯ সালের ক্ষমতায় আসার সময় একটি শিশু জন্ম নিল। সেই শিশু যখন ১৬ বছরে পা রাখবে, তখন তার জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে একই সরকারের শাসনামলে। রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম, সামাজিক পরিবেশ; সবকিছু সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। ফলে যে রাজনৈতিক পরিবেশে সে জন্মেছে, সেটিই তার কাছে হয়ে উঠেছে ‘স্বাভাবিক’ পৃথিবী।

দীর্ঘমেয়াদি একই সরকারের শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে। একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘদিন একই রাজনৈতিক বয়ান শুনে বড় হয়, তবে বিকল্প মতাদর্শ, ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা কিভাবে হবে? কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্য সম্ভাবনাগুলোর সঙ্গে তার পরিচয় হবে ভাবুনতো একবার!

গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো- এখানে মতের বৈচিত্র্য থাকে, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। আওয়ামী লীগের আমলের শুরুতে জন্ম নেওয়া একটা প্রজন্ম যদি শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত ক্ষমতার পরিবর্তন না দেখে, তাহলে তার কাছে রাজনৈতিক পরিবর্তনই অস্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিবেশ যদি ভিন্নমতকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে।

একবার ভেবে দেখুন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জন্ম নেওয়া একটি শিশু ছোট থেকেই দেখে আসছে যে, প্রশ্ন করা বিপজ্জনক, সমালোচনা করা অপরাধের মতো বিবেচিত হয়েছে, কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের সামাজিক ও পেশাগত জীবনে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছে- তখন তার মধ্যে ধীরে ধীরে ভয়, আত্মসংযম এবং একটা অদৃশ্য নেগেটিভ সংস্কৃতি হয়েছে, যা সরাসরি সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে আঘাত করেছে। কারণ, একটি সমাজে সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয়, যখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়। অনেকের মতে, গেলো সরকারের সময়ে এমনই একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যে, যার প্রতিফলন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন ও অস্থিরতায় দেখা দিয়েছিলো।

একটি প্রজন্ম যখন জন্ম থেকেই দেখেছে একটি সরকার, একটি সরকার প্রধান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শাসন ইতিহাসচর্চার ওপরও প্রভাব ফেলছে। একটি প্রজন্ম যদি ইতিহাসকে কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে জানতে শেখে, তাহলে ইতিহাসের বহুমাত্রিকতা তার কাছে অদৃশ্য থেকে যায়। ইতিহাস তখন সত্য অনুসন্ধানের বিষয় না হয়ে রাজনৈতিক বয়ানের অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ একটি প্রজন্মের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

যেখানে একটি প্রজন্ম দেখে আসছে- প্রায় দেড়যুগ ধরে দুর্নীতি, বৈষম্য, রাজনৈতিক সংঘাত, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মতো বিভিন্ন বাস্তবতা; তাহলে সেই প্রজন্মের মানসিকতায় হতাশা ও অবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। কিন্তু, সেইসব বিষয়গুলো থেকে এই প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও নৈতিক চর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে একটি হওয়া উচিত।

যে প্রজন্ম জন্মের পর থেকে একই রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখে বড় হয়েছে, সেই প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে, প্রশ্ন করার অধিকার ও সাহস ফিরিয়ে দিতে হবে। সরকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি নুয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতা যে প্রজন্মের চিন্তা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলেছে, সেই প্রজন্মের গণতান্ত্রিক মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে এখন থেকেই শুরু করতে হবে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে মনোযোগী হতে হবে এই প্রজন্মের চিন্তা ও ভবিষ্যতের উপর। কারণ, আজকের এই ১৬ বছরে আটকে থাকা প্রজন্মই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: