দশভুজা দুর্গা ও আজকের নারী: অশুভ দমন থেকে আধুনিক সমাজ গড়ার রূপকথা
ছবি: এআই জেনারেটেড
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আলো, ঢাকের বাদ্য, উৎসবের আমেজ আর আনন্দের আবাহন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, দেবী দুর্গা দশ হাতে বিভিন্ন অস্ত্র ধারণ করে মহিষাসুরকে বধ করে মর্ত্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ, ন্যায় ও শান্তির প্রতীক।
সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গাকে নারীশক্তির পরম প্রকাশ বা ‘আদি পরাশক্তি’ হিসেবে আরাধনা করা হয়। কিন্তু মণ্ডপে দেখা সেই দশভুজা প্রতিমার তাৎপর্য কি কেবল পৌরাণিক কাহিনিতেই সীমাবদ্ধ? নাকি তাঁর প্রতীকের মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর নারীর বাস্তব জীবন ও সংগ্রামেরও প্রতিচ্ছবি রয়েছে?
একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, পৌরাণিক দেবী দুর্গার প্রতীকী রূপের সঙ্গে আধুনিক নারীর বহুমুখী কর্মপরিধির একটি তাৎপর্যপূর্ণ মিল রয়েছে। পার্থক্য শুধু প্রেক্ষাপটে। দেবী দুর্গা অস্ত্রের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন; আর আধুনিক নারী শিক্ষা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, ধৈর্য, প্রযুক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে হাতিয়ার করে প্রতিদিনের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করছেন।
দেবী দুর্গার সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য তাঁর দশটি হাত। প্রতীকী অর্থে এই দশ হাত বহুমুখী কর্মদক্ষতা ও একই সঙ্গে নানা দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার প্রতীক। আধুনিক নারীর জীবনেও যেন সেই দশভুজা রূপের প্রতিফলন দেখা যায়।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একজন কর্মজীবী কিংবা গৃহিণী নারীকে ঘরের কাজ, সন্তানের লালন-পালন, প্রবীণদের যত্ন, পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি অফিস, সভা, প্রকল্প পরিচালনা কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তও সামলাতে হয়। অনেক নারী একই সঙ্গে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বহুমুখী ভূমিকা আধুনিক সমাজে নারীর সক্ষমতা ও অবদানের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
দেবী দুর্গার দশ হাতে থাকা ত্রিশূল, চক্র, শঙ্খ, গদা, তীর-ধনুক, তলোয়ার, পদ্মসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও প্রতীক তাঁর শক্তি, সামর্থ্য এবং ভারসাম্য রক্ষার প্রতীক। আধুনিক যুগে নারীর হাতে সেই অস্ত্রের জায়গা নিয়েছে শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আইনগত সচেতনতা।
ল্যাপটপ, স্মার্টফোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং চাপের মধ্যেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার ক্ষমতা আজকের নারীর গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। শিক্ষা ও প্রজ্ঞাকে হাতিয়ার করে নারীরা কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করছেন।
পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুর ছিল অশুভ শক্তির প্রতীক। আধুনিক নারীর জীবনেও রয়েছে নানা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য, নারীর যোগ্যতা নিয়ে অযৌক্তিক সন্দেহ, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি এবং পারিবারিক ও পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষার চাপ—এসবই নারীর অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একজন নারী যখন নিজের যোগ্যতা দিয়ে বৈষম্যের প্রাচীর ভাঙেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন কিংবা অন্যায় ও হয়রানির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন, তখন তা সমাজের অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দেবী দুর্গার বাহন সিংহ অদম্য সাহস, শক্তি ও নির্ভীকতার প্রতীক। আজকের নারীও নানা অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি মোকাবিলা করে এগিয়ে চলেছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়া, উড়োজাহাজ চালানো, মহাকাশ গবেষণায় কাজ করা কিংবা দুর্গম অঞ্চলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন—নারীর এমন প্রতিটি সাহসী পদক্ষেপ যেন আধুনিক যুগের ‘সিংহবাহন’ রূপের প্রতিফলন।
দুর্গাপূজার প্রতিমায় দেবী দুর্গার দুই পাশে অবস্থান করেন দেবী সরস্বতী ও দেবী লক্ষ্মী। সরস্বতী জ্ঞান, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার প্রতীক; লক্ষ্মী ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক। আধুনিক নারীও এই দুই শক্তির সমন্বিত রূপ হয়ে উঠেছেন।
শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, শিল্প ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নারীরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। একই সঙ্গে ব্যবসা, ব্যাংকিং, পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ পরিবার ও দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেবী দুর্গার আরেক রূপ উমা বা পার্বতী—মমতা, শান্তি ও সহনশীলতার প্রতীক। আধুনিক নারী কর্মক্ষেত্রে যতই দৃঢ় ও পেশাদার হোন না কেন, পরিবারে তিনি একই সঙ্গে মা, কন্যা বা বোনের মমতাময় ভূমিকা পালন করেন। কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের এই সমন্বয়ও তাঁর মানসিক শক্তির পরিচয় বহন করে।
দেবী দুর্গার আরাধনা তাই শুধু মণ্ডপের চার দেয়াল কিংবা চার দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি নারীশক্তির প্রতি সম্মান, মর্যাদা ও স্বীকৃতিরও প্রতীক। যে নারী সংসারের চাকা সচল রাখেন, হাসপাতালে রাত জেগে মানুষের সেবা করেন, গবেষণাগারে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন কিংবা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যান- তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যেই যেন দশভুজা দুর্গার প্রতীকী শক্তির প্রতিফলন দেখা যায়।
পৌরাণিক দেবী দুর্গা যেমন অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক, তেমনি আধুনিক নারীর অবদান পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীর শক্তি, সংগ্রাম ও অবদানকে শুধু শারদীয় উৎসবের কয়েকটি দিনে নয়, বছরের প্রতিটি দিন শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও সমতার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়াই হোক আধুনিক সমাজের প্রকৃত শারদীয় সংকল্প।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: