অনুদান বা অন্যের টাকায় হজ করলে ফরজ আদায় হবে কি?
হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার পবিত্র হজ পালন করা ফরজ। তবে হজ পালনের জন্য নিজের উপার্জিত অর্থ থাকাই কি শর্ত? অন্য কারো দেওয়া উপহার, অনুদান কিংবা সহযোগিতার অর্থে হজ করলে কি ফরজ হজ আদায় হবে—এ নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ফরজ হজ আদায়ের জন্য নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে হজ করা আবশ্যক নয়। কেউ উপহার, হাদিয়া বা অনুদান হিসেবে পাওয়া অর্থ দিয়ে হজ পালন করলেও তার ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে।
কোনো ব্যক্তির নিজের হজ পালনের সামর্থ্য না থাকলেও যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাকে হজের খরচ উপহার হিসেবে দেয়, তাহলে সেই অর্থে হজ করলে তা তার ফরজ হজ হিসেবেই গণ্য হবে। পরবর্তীতে নিজের আর্থিক সামর্থ্য অর্জিত হলে আবার ফরজ হজ আদায় করা জরুরি হবে না।
একইভাবে, কারও হজ পালনের সামর্থ্য থাকার পরও যদি রাষ্ট্র, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাকে হজের জন্য অর্থ উপহার দেয় এবং সেই অর্থ দিয়ে সে হজ পালন করে, তাহলেও তার ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে পুনরায় হজ করার প্রয়োজন নেই।
তবে নিয়তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি ইহরাম বাঁধার সময় স্পষ্টভাবে নফল হজের নিয়ত করে, তাহলে ওই হজের মাধ্যমে ফরজ হজ আদায় হবে না। আর সাধারণভাবে হজের নিয়ত করলে তা ফরজ হজ হিসেবেই আদায় হবে।
কুরআনে হজের ফরজ হওয়ার ঘোষণা
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালনের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে—এমন মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
اِنَّ اَوَّلَ بَیۡتٍ وُّضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِیۡ بِبَكَّۃَ مُبٰرَكًا وَّ هُدًی لِّلۡعٰلَمِیۡنَ فِیۡهِ اٰیٰتٌۢ بَیِّنٰتٌ مَّقَامُ اِبۡرٰهِیۡمَ ۬ۚ وَ مَنۡ دَخَلَهٗ كَانَ اٰمِنًا ؕ وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الۡبَیۡتِ مَنِ اسۡتَطَاعَ اِلَیۡهِ سَبِیۡلًا ؕ وَ مَنۡ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
অর্থ: ‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হেদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহিম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে কুফরি করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’
(সুরা আল-ইমরান: ৯৬-৯৭)
সামর্থ্য হলে হজে বিলম্ব না করার নির্দেশ
ইসলামে সামর্থ্য অর্জনের পর অযথা হজে বিলম্ব না করার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কারণ মানুষের জীবন অনিশ্চিত। যেকোনো সময় অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক ও অন্যান্য কারণে হজ পালনের সুযোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
১. হজে দ্রুত করার নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ أَرَادَ الْحَجَّ فَلْيُعَجِّلْ فَإِنَّهُ قَدْ يَمْرَضُ الْمَرِيضُ وَتَضِلُّ الضَّالَّةُ وَتَعْرِضُ الْحَاجَةُ
‘যে ব্যক্তি হজের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা আদায় করে নেয়। কারণ সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, প্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে ফেলতে পারে বা কোনো জরুরি প্রয়োজন এসে যেতে পারে।’
(ইবনে মাজাহ: ২৮৮৩)
২. পাঁচ বছর হজ না করার বিষয়ে সতর্কতা
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ إِنَّ عَبْدًا صَحَّحْتُ لَهُ جَسَدَهُ وَوَسَّعْتُ عَلَيْهِ فِي رِزْقِهِ يَمْضِي عَلَيْهِ خَمْسَةُ أَعْوَامٍ لَا يَأْتِينِي يَحُجُّ فَهُوَ مَحْرُومٌ
‘আমি যার শরীর সুস্থ রেখেছি এবং তার রিজিকে প্রশস্ততা দিয়েছি, সে যদি পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমার ঘরে হজ করতে না আসে, তবে সে বঞ্চিত ও হতভাগ্য।’
(ইবনে হিব্বান: ৩৬৯৫)
৩. হজ না করে মৃত্যুবরণ করার বিষয়ে সতর্কবার্তা
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ الْحَجِّ حَاجَةٌ ظَاهِرَةٌ أَوْ سُلْطَانٌ جَائِرٌ أَوْ مَرَضٌ حَابِسٌ فَمَاتَ وَلَمْ يَحُجَّ فَلْيَمُتْ إِنْ شَاءَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا
‘যার সামনে কোনো সুস্পষ্ট প্রয়োজন, জালিম শাসকের বাধা বা অক্ষমতাজনিত রোগ ছিল না, তবুও সে হজ না করে মারা যায়—সে চাইলে ইহুদি হয়ে মরুক, চাইলে খ্রিস্টান হয়ে মরুক।’
(দারেমি: ১৮২৬)
সুতরাং হজের সামর্থ্য অর্জিত হলে অযথা বিলম্ব না করে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নিজের উপার্জিত অর্থ না থাকলেও বৈধভাবে পাওয়া উপহার, অনুদান বা অন্যের দেওয়া অর্থে হজ পালনের সুযোগ হলে তা দিয়েই ফরজ হজ আদায় করা যায়। কারণ ফরজ হজ সহিহ হওয়ার জন্য অর্থটি অবশ্যই নিজের উপার্জিত হতে হবে—এমন শর্ত নেই।
হজ শুধু একটি ফরজ ইবাদতই নয়; একজন মুসলমানের জীবনে এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: