• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

স্ত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে বলেছেন মহানবী (সা.)? জেনে নিন ইসলামের ৮ শিক্ষা

প্রকাশিত: ১৬:৫১, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৬:৫২, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
স্ত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে বলেছেন মহানবী (সা.)? জেনে নিন ইসলামের ৮ শিক্ষা

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে একজন পুরুষের উত্তম চরিত্রের অন্যতম পরিচয় হলো স্ত্রীর সঙ্গে তার আচরণ। পরিবারের বাইরে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেই একজন মানুষ উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়ে যান না; বরং নিজের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রীকে সম্মান করা, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া, ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, এসবই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের বিষয়ে স্বামীদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও তাঁর পারিবারিক জীবনে এসব শিক্ষার বাস্তব উদাহরণ রেখে গেছেন।

 স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে কোরআন
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯)

এই আয়াতে স্ত্রীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দাম্পত্য জীবনে শুধু ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়; স্ত্রীর প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ভালো ব্যবহারও জরুরি। স্ত্রীর কোনো বিষয় অপছন্দ হলেও তার সঙ্গে অন্যায় বা দুর্ব্যবহার করা যাবে না।

স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

এই হাদিসে নবীজি (সা.) বুঝিয়েছেন, একজন মানুষের উত্তম চরিত্রের প্রকাশ শুধু বাইরের আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার ব্যবহারও এর গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। তাই স্ত্রীর সঙ্গে নম্রতা, ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

দাম্পত্য জীবনে মতের অমিল কিংবা ছোটখাটো ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্ত্রীর একটি ভুলের কারণে তার সব ভালো গুণ অস্বীকার করা উচিত নয়।

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব তার ভালো লাগবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, স্ত্রীর কোনো একটি বিষয় অপছন্দ হলেও তার ভালো দিকগুলো মনে রাখা উচিত। ধৈর্য, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর রাখা সম্ভব।

ইসলামে স্ত্রীর অধিকার আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর ভরণপোষণ, পোশাক, নিরাপদ আবাসন এবং প্রয়োজনীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা স্বামীর কর্তব্য।

বিদায় হজের ভাষণেও রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের বিষয়ে বিশেষ উপদেশ দিয়েছেন। তিনি স্ত্রীদের অধিকার আদায় এবং তাদের সঙ্গে ভালো আচরণের তাগিদ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)

অতএব, স্ত্রীকে শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দেখলেই হবে না; তার ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।

সংসারের কাজে সহযোগিতা করতেন নবীজি (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণের উপদেশই দেননি, নিজের জীবনেও তার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়েছেন।

হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, ‘তিনি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য বেরিয়ে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)

এ থেকে বোঝা যায়, সংসারের কাজে সহযোগিতা করা এবং পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোও উত্তম চরিত্রের অংশ। ঘরের সব কাজ শুধু স্ত্রীর দায়িত্ব, এমন ধারণা ইসলামের নবীর পারিবারিক জীবনের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণে ইসলামের ৮ শিক্ষা
ইসলামের শিক্ষা ও নবীজির আদর্শ অনুসরণ করে একজন স্বামীর উচিত:
১. নম্রভাবে কথা বলা: স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর ভাষায় কথা বলা এবং অপমানজনক শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
২. মতামতের মূল্য দেওয়া: পারিবারিক সিদ্ধান্তে স্ত্রীর মতামত ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
৩. ভুল ক্ষমা করা: ছোটখাটো ভুল নিয়ে অযথা ঝগড়া না করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা।
৪. অধিকার নিশ্চিত করা: স্ত্রীর ভরণপোষণ, পোশাক ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা।
৫.সংসারের কাজে সহযোগিতা করা: সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের কাজে পাশে দাঁড়ানো।
৬. আত্মীয়স্বজনকে সম্মান করা: স্ত্রীর পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা।
৭. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা: রাগের সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন থেকে বিরত থাকা।
৮. ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষা করা: স্ত্রীর গোপনীয়তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সুরক্ষিত রাখা।

পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে ভালোবাসা ও দয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২১)

দাম্পত্য জীবন কেবল একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়; বরং এটি পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সম্মান ও সহমর্মিতার সম্পর্ক। স্বামী যেমন স্ত্রীর কাছ থেকে ভালোবাসা ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর কাছ থেকে সম্মান, নিরাপত্তা ও সুন্দর আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

তাই একজন আদর্শ স্বামী হওয়ার জন্য শুধু পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, স্ত্রীকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তার অধিকার আদায় করাও জরুরি। কেননা, পরিবারের সঙ্গে সুন্দর আচরণই একজন মানুষের উত্তম চরিত্রের অন্যতম পরিচয়।

বিভি/এনএইচ

মন্তব্য করুন: