• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ন্যায্য ও জলবায়ু সহনশীল নগর গড়তে অর্থায়নের আহ্বান নাগরিক সমাজের

প্রকাশিত: ২১:০৮, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ন্যায্য ও জলবায়ু সহনশীল নগর গড়তে অর্থায়নের আহ্বান নাগরিক সমাজের

বিশ্ব নগর দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জাস্ট আরবান ট্রানজিশন কনফারেন্স ২০২৬’। সম্মেলনে নগর পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষাবিদ, পরিবেশকর্মী, তরুণ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নিরাপদ আবাসন, বায়ুদূষণ, পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন। নগর উন্নয়নে সামাজিক ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং নীতিনির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এমএসি অডিটোরিয়ামে (MAC Auditorium) এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ব্রাইটার্সের চেয়ার ফারিহা সুলতানা আউমির সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু মানুষ দরিদ্রই থেকে গেছে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দারিদ্র্য মোকাবিলা করতে পারলে সেটিকে ন্যায্য রূপান্তর বলা যেত। আজ আমাদের শহরগুলো দূষিত, কিন্তু দূষণ কেবল একটি উপসর্গ। আমরা সমস্যার মূল কারণের চেয়ে উপসর্গের চিকিৎসা করতেই বেশি আগ্রহী। উন্নয়নের আগে আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা ও শৃঙ্খলা এবং এমন একটি শহর, যেখানে ধনী ও দরিদ্র উভয়েই বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।”

‘জলবায়ু সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গঠন: আবাসন, পরিচ্ছন্ন বায়ু, পানি নিরাপত্তা ও নগর শাসনব্যবস্থা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ফজলে রেজা শুমন। আলোচনায় নগর পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ব্রাইটার্স ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “তরুণদের সম্পৃক্ততা কেবল বাস্তবায়ন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তরুণদের শুধু নীতি বাস্তবায়নের জায়গায় নয়, নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরেও থাকতে হবে। একটি ন্যায্য নগর রূপান্তর এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে শ্রেণি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।”

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইয়েডো) প্রতিষ্ঠাতা রবিউল ইসলাম বলেন, “মাত্র তিন মাসে আমাদের পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকার ৩৫০টিরও বেশি বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে, উৎস পর্যায়েই বর্জ্য পৃথক করা ও আলাদাভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব। ন্যায্য নগর রূপান্তরের জন্য শহরের সমস্যাগুলো যেখানে সবচেয়ে দৃশ্যমান, সেখান থেকেই কাজ শুরু করতে হবে এবং উদ্যোগী তরুণদের ওপর আস্থা রাখতে হবে।”

‘জলবায়ু সহনশীল নগর’ শীর্ষক অধিবেশনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ১৭তম নির্বাহী পর্ষদের সহসভাপতি (১) শাইখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান। আলোচনায় নগরের তাপপ্রবাহ মোকাবিলা, সবুজ পরিসর সম্প্রসারণ, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান এবং জলবায়ু অভিযোজন জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ অধিবেশনে অংশ নেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উপপরিচালক মো. তারেকুজ্জামান, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মো. হাফিজুর রহমান, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী।

সম্মেলনের সমাপনী পর্বে নীতিগত সংলাপে সভাপতিত্ব করেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। আলোচনায় নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং কপ-৩১ (COP31)-সহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তরুণদের নগর ও জলবায়ুবিষয়ক এজেন্ডা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মোহাম্মদ এজাজ বলেন, “যে শহর তার সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে বড় হয়, সেই শহর আসলে উন্নতি করছে না; বরং তার বিদ্যমান অবিচারকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছে। ঢাকায় আবাসনের সুযোগ নির্ধারিত হয় মানুষের অর্থ দেওয়ার সামর্থ্যের ভিত্তিতে। অথচ যাদের আবাসন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদেরই প্রমাণ করতে বলা হয় যে তারা সেখানে থাকার যোগ্য। শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখা শ্রমজীবী মানুষকে বলা হয়, এই শহরে বসবাস করার সামর্থ্য তাদের নেই। যত দিন পর্যন্ত একটি ছাদ মানুষের অধিকার না হয়ে পুরস্কারে পরিণত থাকবে, তত দিন ঢাকা আরও উঁচু হবে, কিন্তু আরও ন্যায্য হয়ে উঠবে না।”

সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসন ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ নীতিগত উপদেষ্টা ড. মো. শিবলী সাদিক এবং সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক শোহাইল সাইফুল্লাহ।

আয়োজকদের মতে, ন্যায্য নগর রূপান্তরের জন্য সামাজিক ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার, জলবায়ু অভিযোজন, নাগরিক অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাসযোগ্য ও টেকসই নগর গড়তে সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিভি/কেএস/পিএইচ

মন্তব্য করুন: