• বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২ | ৭ মাঘ ১৪২৮

BVNEWS24 || বিভিনিউজ২৪

সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালায় কারা?

প্রকাশিত: ১১:৫৯, ২৮ নভেম্বর ২০২১

আপডেট: ১৫:৫৩, ৯ ডিসেম্বর ২০২১

ফন্ট সাইজ
সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালায় কারা?

সংগৃহীত ছবি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার গাড়ির চাপায় পৃথক ঘটনায় এক শিক্ষার্থীসহ মারা গেছেন দু’জন। এসব ঘটনায় গাড়িচালক হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে হানিফ, রাসেল ও হারুন নামে তিনজনকে। কিন্তু গ্রেফতার তিনজনের কেউ-ই এসব গাড়ি চালানোর জন্য সিটি করপোরেশন থেকে নিয়োগ বা অনুমতি কোনোটিই পাননি। প্রশ্ন উঠছে সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া ময়লার গাড়িগুলো চালাচ্ছে কারা?

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র বলছে, বুধবার (২৪ নভেম্বর) দুপুর সোয়া বারোটার দিকে রাজধানীর গুলিস্তান মোড়ে নিহত নটরডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দেওয়া ময়লার গাড়ির চালক রাসেল-এর কোনো লাইসেন্স ছিলো না। তিনি ডিএসসিসি থেকে অনুমতি বা নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো চালকও নন। তিনি মূলত হারুন মিয়া নামে একজনের কাছ থেকে ট্রিপভিত্তিতে ময়লা নেওয়ার কাজে গাড়ি চালাতেন। প্রতিটি ট্রিপ হিসেবে হারুনের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পেতেন রাসেল। আবার হারুনও ডিএসসিসি থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত কোনো চালক নন। তারও লাইসেন্স নেই। মূলত গাড়িটির চালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন ইরান মিয়া নামের এক ব্যক্তি। তবে দুজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইরান মিয়া’র কাছ থেকে গাড়ি চালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন হারুন। অর্থাৎ ইরান মিয়া’র নামে বরাদ্দকৃত গাড়িটি ৫ হাত ঘুরে পেয়েছেন গাড়ির হেলপার রাসেল। সেই রাসেলের অদক্ষতা আর বেপরোয়া গতিতে প্রাণ গেলো কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসান-এর।

একইভাবে, বৃহস্পতিবার (২৫ নভেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর পান্থপথে নিহত আহসান কবিরকে চাপা দেওয়া ডিএনসিসি’র ময়লার গাড়িটির চালক হানিফ (২৩), ডিএনসিসি কর্তৃক নিয়োগ বা চুক্তিভিক্তিক কোনো চালক ছিলেন না। তার হালকা যান চালানোর লাইসেন্স থাকলেও ছিলো না ভারী যান চালানোর কোনো লাইসেন্স। এমনকি ডিএনসিসি’র কোনো অস্থায়ী কর্মচারীও নন তিনি। তবুও দেড় বছর ধরে ডিএনসিসি’র ভারী যান (ময়লার ট্রাক) চালিয়ে আসছিলেন গ্রেফতারকৃত হানিফ। মূলত ডিএনসিসি’র চালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রুবেল উদ্দিন-এর কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে ট্রাকটি চালাতেন হারুন। এজন্য তাকে কোনো বেতন দিতে হতো না। শুধুমাত্র গাড়ির তেল চুরি করেই বেতনের টাকা তুলে ফেলতেন হানিফ। যার একটি অংশ পেতেন মূল চালক রুবেলও। আবার রুবেল নিজে গাড়ি না চালিয়ে মাস শেষে ডিএনসিসি থেকে বেতন তুলতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএসসিসি ও ডিএনসিসিতে মোট ময়লার গাড়ি ৪৮২টি। এর মধ্যে ডিএসসিসিতে রয়েছে ৩১৭টি। কিন্তু চালক আছেন মাত্র ১৭৩ জন। বাকি ১৪৪টি গাড়ি চলে অস্থায়ী চালক দিয়ে। একইভাবে ডিএনসিসিতে ময়লার গাড়ির সংখ্যা ১৬৫টি। অথচ চালক আছেন মাত্র ৮৬ জন। বাকি ৭৯টি গাড়ি চলে অস্থায়ী চালক দিয়ে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, নিয়োগপ্রাপ্ত চালকরা ২৫৯টি গাড়ি চালালেও বাকি আরও ২২৩টি গাড়ি চালানোর কথা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং লাইসেন্সধারী চুক্তিভিত্তিক চালকের। কিন্তু সেই জায়গায় নিয়ম না মেনেই বাকি গাড়িগুলো চালান বহিরাগত অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত চালকদের ভাড়া করা লোক অথবা কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি, মশককর্মী, ক্লিনার কিংবা এমএলএসএস-এর কর্মীরা। অথচ এসব ব্যক্তিদের গাড়ি চালানোর কোনো লাইসেন্স-ই নেই। কিছুদিন চালকের সহাকারি হিসেবে কাজ করতে করতে গাড়ি চালানো শিখেছে, এমন ব্যক্তিরা অল্প টাকায় সিটি করপোরেশনের ময়লার ভারী গাড়িগুলো চালানোর দায়িত্ব পেয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন মিয়া বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, নটরডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈমকে যে চালক চাপা দিয়েছেন সেই রাসেলকে গ্রেফতার করার পর আমরা জানতে পারি ওই ময়লার গাড়ির মূল চালক হারুন মিয়া নামের এক ব্যক্তি। এরপর আমরা হারুন মিয়াকেও গ্রেফতার করি। এরপর তাদের দু’জনকে তিনদিনের রিমান্ডে পাই আমরা। রিমান্ডে হারুন জানিয়েছে, সেও ময়লার ট্রাকটির মূল চালক নয়। অর্থাৎ ডিএসসিসি থেকে সে নিয়োগপ্রাপ্ত চালক নয়। সে যে ট্রাকটি চালাচ্ছিলো সেই ট্রাকটি যার নামে বরাদ্দ সেই চালকের নাম ইরান মিয়া। যাকে হারুন বা রাসেল চিনতো না। ইরান মিয়া’র কাছ থেকে অন্য দুজন ব্যক্তির মাধ্যমে হারুন গাড়িটি চালানোর সুযোগ পায় দেড় বছর ধরে। এসময় ট্রাকের হেলপার হিসেবে পরিচয় হয় রাসেল-এর সংগে। বছরখানেক ধরে রাসেল হারুন-এর সংগে চুক্তিতে ট্রাকটি চালাচ্ছিলো। প্রতি ট্রিপে রাসেল ১০০ টাকা করে পেতো। এভাবে দিনে চার থেকে পাঁচটি ট্রিপ দিতো রাসেল। প্রতি ট্রিপে যে তেল বরাদ্দ দেওয়া হতো তার থেকে কিছু তেল চুরি করে টাকা আয় করতো হারুন। হারুনের জন্য প্রতি ট্রিপে তেল বরাদ্দ থাকতো ১১ লিটার। সে এখান থেকে ৪-৫ লিটার তেলের টাকা চুরি করতো। এটাই তার আয়। এই আয়ের একটা বড় অংশ মাস শেষে পেতো ইরান মিয়া নামের মূল চালক।

তিনি বলেন, যেহেতু ইরান মিয়া ডিএসসিসি’র নিয়োগপ্রাপ্ত চালক তাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সেই সংস্থা। আমরা রিমান্ডে ইরান মিয়া এবং আরও অন্যান্য যেসব ব্যক্তিরা এসব অনিয়মে জড়িত তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছি। রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার পান্থপথে ময়লার ট্রাক চাপায় নিহতের ঘটনায় হানিফকে গ্রেফতার করেছি আমরা। শুক্রবার রাতে চাঁদপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১ এর একটি টিম। গ্রেফতারের পর আমরা জানতে পেরেছি চালক হানিফ ডিএনসিসি’র কর্মচারী নন। তার একটি হালকা যান চালানোর লাইসেন্স রয়েছে। তবে ভারী যান চালানোর কোনো লাইসেন্স নেই। ওই লাইসেন্স দিয়েই সে অন্য আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে মূল চালকের কাছ থেকে গাড়িটি চালানোর সুযোগ পেয়েছে। এজন্য তাকে কোনো বেতন দেওয়া হতো না। করপোরেশন থেকে প্রতিদিন গাড়ির জন্য যে তেল বরাদ্দ দেওয়া হতো সে তেলের টাকা চুরি করেই একটা অর্থ পেতো। কিভাবে হানিফরা এধরণের সুযোগ পেলো তা নিশ্চয় তদন্তে উঠে আসবে। তাছাড়া নিশ্চয়ই করপোরেশনও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

অনুমতি না পেয়েও ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ি চালাচ্ছে অদক্ষ চালকরা- এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফরিদ আহাম্মদ বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চলে আসছিলো। তবে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ৪০ জনের মতো ব্যক্তিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ময়লার গাড়ি নিয়ে সম্প্রতি যে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে, সেটিও আমরা তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করেছি। তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেক দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি পেতে হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

একই কথা বললেন ডিএনসিসি’র মেয়র মো. আতিকুল ইসলামবাংলাভিশন ডিজিটালকে তিনি বলেন, পান্থপথের ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত কমিটি তদন্তে যা যা অনিয়মের প্রমাণ পাবে, সেই অনুযায়ী আইনগত সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হবে না। অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে।

তিনি বলেন, এখন থেকে ডিএনসিসি’র প্রতিটি গাড়ি সিসিটিভি দ্বারা মনিটরিং করে হবে। সেই সংগে জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমেও ট্র্যাকিং করা হবে। কোন চালকের মনোভাব কেমন সব কিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ময়লার গাড়ির চাপায় ১১ মাসে পাঁচ মৃত্যুঃ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তুলনামূলক অপরাধ বিবরণীর তথ্য বলছে, চলতি বছরের গত ১১ মাসে শুধু ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির চাপায় মারা গেছেন অন্তত পাঁচজন।

চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির চাপায় রাজধানীর দয়াগঞ্জে প্রাণ হারান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) টেলিফোন অপারেটর মোহাম্মদ খালিদ মুন্না (৫৫)। তিনি মোটরসাইকেলে পল্টনের অফিসে যাচ্ছিলেন। 

এরপর গত ১৬ এপ্রিল সকালে যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা এলাকায় ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মোস্তাফা (৪০) নামের এক রিকশাচালক নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত হন রিকশার আরোহী হরেন্দ্র দাস (৭০) নামের অপর এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় জনতা ওই সময় ময়লার গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পালিয়ে যায় চালক।

২ মে শাহজাহানপুরে ডিএসসিসি’র ময়লার ট্রাকের চাপায় স্বপন আহমেদ দিপু (৩৩) নামের এক ব্যাংক কর্মচারী নিহত হন। তিনি মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন। 

গত ৯ আগস্ট রাজধানীর শ্যামপুরে সাবান ফ্যাক্টরির গলি এলাকায় ফারুক হোসেন নামের এক পোশাক শ্রমিককে চাপা দেয় ডিএসসিসি’র একটি ময়লার গাড়ি। ফারুক হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান। 

সর্বশেষ গত ২৪ নভেম্বর ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারান নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান।

শুধু তাই নয়, ডিএমপি’র অপরাধ পর্যালোচনার তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের গাড়ি চাপায় মারা গেছেন অন্তত ২৭ জন। যাদের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকি ১৭ জনের পরিচয় অজ্ঞাত। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মর্যাদার কর্মকর্তা বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, গত কয়েক বছরে ময়লার গাড়ির চাপায় যতোগুলো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, প্রত্যেকটি ঘটনার মূল কারণ ছিলো, বেপরোয়া গতি এবং অদক্ষ চালক। এ বিষয়ে সংস্থা দুটিকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা নির্বিকার। যখনি তাদের কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় তখনি তারা তৎপর হয়ে যায়। তখন বিভিন্ন মহল থেকে তদবির করা শুরু হয়। তাই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে সম্প্রতি দুটি মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চ পর্যায় থেকে সব ইউনিটকে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে, যে সংস্থার গাড়িই হোক, আইনের ব্যত্যয় ঘটলেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবর রহমান বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, সিটি করপোরেশনের গাড়িগুলোর বেপরোয়া গতি এবং অদক্ষ চালকের বিষয়ে বারবার দুই সিটি করপোরেশনকে অবহিত করা হয়েছিলো। তারা শোনেনি। তাই এবার আমরা আমাদের সর্বোচ্চ আইন প্রয়োগ করতে সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি।

বিভি/এসএইচ/এসডি

মন্তব্য করুন: