• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অবশেষে জজ হলেন বাগানবিলাসী ইবি শিক্ষার্থী রায়হান

তালুকদার হাম্মাদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
অবশেষে জজ হলেন বাগানবিলাসী ইবি শিক্ষার্থী রায়হান

মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। কেউ কঠোর সাধনায় নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন, আবার কেউ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। তবে ব্যর্থতা যে জীবনের শেষ নয়, বরং নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হতে পারে- তারই উদাহরণ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের শিক্ষার্থী রোকনুজ্জামান রায়হান।

সরকারি মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর আইনকে পেশা হিসেবে বেছে নেন রায়হান। এরপর কঠোর অধ্যবসায় ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং বাগান করার শখও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।

২০০১ সালে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের মৌয়ামারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রায়হান। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। তার বাবা আনোয়ারুল হক একটি দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট (সহকারী সুপার) হিসেবে কর্মরত। মা রাহেনা বেগম গৃহিণী। বাড়ির কাছের মৌয়ামারী ডাঙ্গাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন রায়হান। পরে কৈমারী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক এবং রংপুর সরকারি কলেজ থেকে একই বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন।

উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরকারি মেডিকেলে ভর্তির চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি। এরপর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সামগ্রিক মেধাতালিকায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। পরে অনার্স সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে একই বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছেন।

ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল রায়হানের। উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরকারি মেডিকেলে ভর্তির জন্য জোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ নম্বরের জন্য মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হারান তিনি। পরবর্তী সময়ে আইন পড়ার পাশাপাশি বিচারক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে চূড়ান্তভাবে ভর্তির সুযোগ পেলেও সেটি ছেড়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ক্যাম্পাসের সিনিয়র সোহেল রানা, বর্তমানে রংপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, তাকে জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। পরে ওই সিনিয়রের বিচারিক কার্যক্রম ও নথিপত্র কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহ আরও বাড়ে রায়হানের।

একপর্যায়ে নিজের বিভাগের কয়েকজন জুনিয়রকে পড়ানো ও গাইডলাইন দেওয়া শুরু করেন তিনি। পরে সেটি একটি নিয়মিত ব্যাচে রূপ নেয়। জুনিয়রদের বিভিন্ন বিষয় বোঝাতে গিয়ে নিজেকেও একাধিক বই ও রেফারেন্স পড়তে হতো। অনেক সময় একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য ৮ থেকে ১০টি বই ও রেফারেন্স ঘেঁটে দেখতেন তিনি। এতে নিজের ধারণা আরও পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি জুডিশিয়ারি পরীক্ষার প্রস্তুতিও শক্তিশালী হয়।

এর ফলও পান তিনি। মাস্টার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রথমবারের চেষ্টাতেই ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সফল হন রায়হান। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে তিনি সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও রয়েছে রায়হানের গভীর টান। সেই ভালোবাসা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের দ্বিতীয় তলায় গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি বাগান।

তার বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, বাগানবিলাস, কাঠগোলাপ, অ্যাডেনিয়ামসহ প্রায় শতাধিক প্রজাতির গাছ রয়েছে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনার পর মানসিক চাপ অনুভব করলে তিনি চলে যেতেন নিজের সেই বাগানে। কিছুক্ষণ গাছের পরিচর্যা করলেই অস্বস্তি অনেকটা কেটে যেত বলে জানান তিনি।

রায়হানের কাছে তার বাগান যেন সফলতার পথচলার এক ‘প্রতীকী বন্ধু’।

জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি একটি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদেও উত্তীর্ণ হয়েছেন রায়হান। জুডিশিয়ারিতে পদায়নের আগে কিছুদিন ব্যাংকে চাকরি করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ারও প্রবল আগ্রহ রয়েছে রায়হানের। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে আবেদন করে নিয়োগ পেলে সিভিল জজের পদ ছেড়ে শিক্ষকতা করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

নিজের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে রোকনুজ্জামান রায়হান বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার সাহায্যেই আমি এ জায়গায় পৌঁছেছি। তাই তার দরবারে অনেক শুকরিয়া আদায় করছি। পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও সব শুভাকাঙ্ক্ষীকেও ধন্যবাদ জানাই।’

বিচারক হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একজন বিচারকের মূল কাজ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই একজন বিচারক হিসেবে কোনো চাপ, প্রভাব বা অর্থের কাছে মাথা নত না করে নিরপেক্ষভাবে আইন ও বিবেক দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব, ইনশাআল্লাহ।’

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত