মানিকগঞ্জের হাবিবুর রহমান পেলেন জাতীয় ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মানিকগঞ্জের শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোঃ হাবিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ‘গুণী শিক্ষক’হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সম্মাননা মেডেল ও সনদপত্র গ্রহণ করেন। সম্মাননা হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
জানা যায়, জেলা, উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানবিক বিকাশে ভূমিকা, পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও দীর্ঘদিনের অবদানের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়।
হাবিবুর রহমানের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার জন্ম মাগুরা জেলায়। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার বাবা আবুল কালাম ও মা ফাতেমা খাতুন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। তার স্ত্রী ঢাকার একটি কলেজের ইংরেজী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এমফিল গবেষনায় যুক্ত আছেন।
শৈশব থেকেই শিক্ষকতা পেশার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। জ্ঞান বিতরণ, শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের বিকাশ এবং সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই শিক্ষকতাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।
হাবিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (বিএসএস অনার্স) পরীক্ষায় ৪-এর মধ্যে ৩.৬৭ সিজিপিএ এবং স্নাতকোত্তর (এমএসএস) পরীক্ষায় ৩.৮০ সিজিপিএ অর্জন করেন। বর্তমানে একই বিভাগে এমফিল গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। এমফিল গবেষণার প্রথম পর্ব প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। ভবিষ্যতে তার ইউরোপের কোনো একটি দেশে পিএইচডি করারও ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, হাবিবুর রহমান ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইতিহাস, ভূগোল, পৌরনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পাঠদান করছেন।
পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে কাজ করেন তিনি। নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশেও গুরুত্ব দেন। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করা এবং নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়াকে তিনি শিক্ষকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মনে করেন।
আধুনিক ও শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তিনি। এসব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা, উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রেও সক্রিয় হাবিবুর রহমান। তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
শিক্ষাজীবনেও রয়েছে তাঁর একাধিক অর্জন। ২০১১-২০১২ সালে ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি EBL-DUAA Inspiration Award অর্জন করেন। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (EBL) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
২০১৪ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অনুষ্ঠিত One Young World Summit-এ বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন হাবিবুর রহমান। সেখানে বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে শিক্ষা, নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান তিনি।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তদাতাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন "বাঁধন" এ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। রক্তদান, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে দেশ ও সমাজের জন্য যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।’ ভবিষ্যতে ইউরোপের কোন দেশে পিএইচডি করার ইচ্ছা আছে। এর জন্য সকলের দোয়া কামনা করেন।
হাবিবুর রহমানের এই অর্জনে গর্বিত শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ লুকমান হোসেন। তিনি বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে এটি আমার অহংকার এবং গর্বের জায়গা। আমি দীর্ঘদিন যাবৎ যে প্রতিষ্ঠানে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছি, সেখান থেকে আমি তাকে বাছাই করেছি। এরপর তিনি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। এটি আমার জন্য অহংকারের জায়গা।’
জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ আমীর হোসেন বলেন, ‘সকল পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনি নির্বাচিত হন। তার প্রোফাইলে যেমন ছিল সেখানে আমরা আশাই করি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। এটা শুধু আমার নয় সারা মানিকগঞ্জ বাসীর জন্য ভালো।’##
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: