• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

কৃষকের বন্ধু রোবট বানিয়ে বিশ্বজয় হাসিবুরের 

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬:০২, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কৃষকের বন্ধু রোবট বানিয়ে বিশ্বজয় হাসিবুরের 

ছবি: হাসিবুর রহমান খান

ছোটবেলা থেকেই ছোট-বড় যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করার নেশা। ভাঙা যন্ত্র খুলে দেখা, নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা আর প্রযুক্তির প্রতি অদম্য কৌতূহল ; এসবই যেন ধীরে ধীরে গড়ে দিয়েছে এক উদ্ভাবকের ভিত। সেই কৌতূহলকে শক্তিতে পরিণত করে এবার বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন মানিকগঞ্জের তরুণ উদ্ভাবক হাসিবুর রহমান খান। কৃষকদের সহায়তায় তৈরি করেছেন বিশেষ ধরনের একটি কৃষি রোবট। আর সেই উদ্ভাবন নিয়েই মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে অর্জন করেছেন একাধিক পুরস্কার। 

তিনি খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নের রৌহাদহ গ্রামের সন্তান হাসিবুরের এই সাফল্যে গর্বিত তাঁর পরিবার, স্বজন ও গ্রামবাসী। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরস্কার জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না তিনি। 

তার স্বপ্ন, নিজের উদ্ভাবিত রোবট দেশের কৃষকের কাজে লাগবে। জমির মাটির অবস্থা বুঝে প্রয়োজনীয় সার ও পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেবে, ফসলের রোগ ও ক্ষতিকর আগাছা শনাক্ত করবে এবং কৃষিকাজে সময় ও খরচ কমাতে সহায়তা করবে। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবার সরকারের সহযোগিতা ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এই তরুণ উদ্ভাবক।

মাটির প্রকৃত অবস্থা না জেনে সার প্রয়োগ, সেচের পানির অপচয়, ফসলের রোগ শনাক্তে দেরি এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যয়—এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় আমাদের দেশের কৃষকদের। এসব সমস্যা সমাধানের চিন্তা থেকেই হাসিবুর তৈরি করেছেন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি রোবট।

হাসিবুরের উদ্ভাবিত রোবটটি জমিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল করে মাটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও আর্দ্রতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে মাটিতে কোন উপাদানের ঘাটতি রয়েছে, সে সম্পর্কে কৃষককে ধারণা দেয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সার ব্যবহারের পরামর্শ ও সেই সার জমিতে প্রয়োগও করতে পারে এই রোবট।  

রোবটটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার। এতে যুক্ত ক্যামেরা ফসলের পাতা ও উদ্ভিদের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগাক্রান্ত অংশ এবং ক্ষতিকর আগাছা শনাক্ত করতে পারে।

কৃষিবিদদের মতে, ফসলের রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে ক্ষতিকর আগাছা শনাক্ত করতে পারলে আগাছা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। এতে ফসলের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় শ্রম ও ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

দেখা যায়, রোবটটি মুঠোফোনের সঙ্গে ওয়াই-ফাই কিংবা ব্লুটুথের মাধ্যমে সংযুক্ত করা যায়। ফলে কৃষক মুঠোফোনে রোবটের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং এর চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

তবে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পর হাসিবুরের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ উদ্ভাবনটিকে বাস্তব কৃষিক্ষেত্রে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। শুধু পুরস্কার অর্জন নয়, তার তৈরি প্রযুক্তি যেন দেশের সাধারণ কৃষকের উপকারে আসে, সেটিই এখন তার মূল লক্ষ্য।

নিজের উদ্ভাবন দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন হাসিবুর রহমান খান বলেন, ১ মাস সময় ব্যয় করে এই রোবট তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমি সেই রোবট নিয়ে মালয়েশিয়ার সাইবারজায়ায় মাল্টিমিডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড সাসটেইনেবল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গোলস ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেই। সেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ভাবকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়  এই প্রতিযোগিতা। আমি সেখানে ‘এনভায়রনমেন্টাল  সায়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হই এবং অর্জন করি প্লাটিনাম উইনার বা চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড।

এ ছাড়া সব বিভাগ মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশবিষয়ক বিশেষ সম্মাননা ও স্বর্ণপদকও দেয়া হয় আমাকে। 

হাসিবুরের বাবা আব্দুল ওয়াহাব খান বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ছেলে প্রথম স্থান অধিকার করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। আমি  মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী  আফরোজা খানম রিতার সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সরকার যেন পাশে থাকে আমার ছেলের। সরকারের সহযোগিতা পেলে কৃষি রোবটটির আরও উন্নয়ন, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।’

মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘হাসিবুরের এই উদ্ভাবন দেশের কৃষকদের জন্য উপযোগী করে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে খুব ভালো হবে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মাটির গুণাগুণ নির্ণয়, ফসলের রোগ শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও পানি ব্যবহারে এ ধরনের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং কৃষকদের ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

বিভি/এআই

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত