• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ: ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র কবিকে উদযাপনের উজ্জ্বল মঞ্চ

প্রকাশিত: ১৪:১৩, ১১ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ১৪:১৩, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ফন্ট সাইজ
রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ: ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র কবিকে উদযাপনের উজ্জ্বল মঞ্চ

“…স্পর্শকাতরতাময় এই নাম
উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,
অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা–
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্ট কিন্তু ভেতরে-ভেতরে
খুব শক্তিশালী
মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।…”

যুদ্ধের বিরুদ্ধে, মানবতার সপক্ষে রফিক আজাদের অনবদ্য এক কবিতা ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’। চুনিয়া নামক ছোট্ট এক গ্রামের রূপকে কবি এখানে এমন এক রাষ্ট্রের দ্রষ্টা, যা যুদ্ধ, সংঘাত ও হানাহানি থেকে মুক্ত, এক অপার্থিব ভূখণ্ড। ঠিক গ্রিক পুরাণে বর্ণিত স্বর্গীয় ভূমি আর্কেডিয়ার মতো। প্রকৃতি নির্ভর, শান্ত, সরল আর সুখী সেই জনপদ। কেবল স্বদেশ-চেতনা নয়, মানুষের সপক্ষে উচ্চারিত তার এইসব সৃষ্টিকর্মের আবেদন বিশ্বজনীন।  

বাংলা কবিতার আধুনিক কালপর্বের অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় নতুন মানচিত্র আঁকার অন্যতম কারিগর। দ্রোহ, বিপ্লব, স্বদেশ-চেতনা, মানবতা তার কবিতার বিশিষ্ট উপাদান। 

সমালোচকদের মতে, ষাটের দশকের কবিদের সঙ্গে নিয়ে রফিক আজাদ বাংলাদেশের কবিতায় নতুন এক পটভূমি রচনা করেছেন। যা আধুনিক বাংলা কবিতার অগ্রগমনে বিশেষ এক অধ্যায়। 

১৯৪৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার আওতাধীন গুণী গ্রামে জন্ম এই কবির। মৃত্যু ২০১৬ সালের ১২ই মার্চ। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন তিনি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই কবি। 

লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলেও বাংলাদেশের মানুষের লড়াই, সংগ্রাম, প্রেম ও বিদ্রোহে আজও প্রাসঙ্গিক কবি রফিক আজাদ। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতিথযশা এই কবির সমগ্র সৃষ্টিসম্ভার সংরক্ষণ, নবীন থেকে নবীনতর প্রজন্মের কাছে তার কাব্যদর্শন পৌঁছে দেয়া এবং একই সাথে কবিকে স্মরণ ও উদযাপনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ’। 

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের গুণীজনদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এই পর্ষদ। মূলত কবির জন্মোৎসব এবং প্রয়াণদিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষে ২০১৭ সালে পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা হয় এই পর্ষদের। কিন্তু ক্রমেই সেই গণ্ডি পেরিয়ে শিল্প-সংস্কৃতির একটি জাতীয় মঞ্চে পরিণত হয় তা। নিয়মিত কবিতা পাঠ, আলোচনা সভাসহ সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন এবং রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এ পর্ষদ। 

২০২১ সাল থেকে ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে রফিক আজাদের জন্মোৎসব উৎযাপনের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো পুরস্কৃত করা হয় বিশিষ্ট কবি ফারুক মাহমুদকে। এরপর থেকে প্রতি বছর এই যাত্রা অব্যাহত আছে। এ যাবত ছয়জন কবিকে দেয়া হয়েছে আলোচিত এই পুরস্কার। ক্রেস্ট, উত্তরীয় ও ৫০ হাজার টাকা অর্থমূল্য দিয়ে কবিদের এই সম্মান জানানো হয়।  

কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং কবির সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে গঠিত হয় ৩১ সদস্য বিশিষ্ট ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ’। কবির জন্ম ও মৃত্যুদিবস উদযাপন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পুরস্কার প্রদান ছাড়াও এই পর্ষদের অন্যান্য কাজের মধ্যে একটি কবির অপ্রকাশিত রচনাসমূহ সম্পাদনা করে প্রকাশের ব্যবস্থা করা। কবির বিভিন্ন কবিতার আবৃত্তি, তার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ, তাকে নিয়ে বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যকের আলোচনা সম্বলিত একটি ওয়েবসাইটও পরিচালনা করে এই পর্ষদ। https://rafiqazad.com/ নামের এই ওয়েবসাইটে ঢুকে পাঠকেরা খুব সহজেই রফিক আজাদের কাব্যসম্ভার উপভোগ করতে পারবেন। জানতে পারবেন পর্ষদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও।  

‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন। প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিও এর সভাপতি ছিলেন। বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কবি ফারুক মাহমুদ। নানা অঙ্গনের গুণীজনদের সমাবেশে প্রকৃতার্থেই এক আলোকিত মঞ্চ ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ’। 

তবে এই পর্ষদের প্রধান কাণ্ডারি স্বয়ং রফিক আজাদের স্ত্রী। তিনি আর কেউ নন, স্বনামধন্য কবি ও গবেষক দিলারা হাফিজ। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক এই চেয়ারম্যান পর্ষদের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। 

প্রধানত কবি হলেও গবেষণা ও গদ্য-পদ্য মিলিয়ে ইতোমধ্যে দিলারা হাফিজের ২২-এর অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'বাংলাদেশের কবিতায় ব্যক্তি ও সমাজ (১৯৪৭–১৯৭১)' শীর্ষক তার গবেষণা গ্রন্থটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বুক হিসেবে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভূক্ত আছে।

কবি দম্পতির দুই ছেলে অব্যয় আজাদ ও অভিন্ন আজাদও প্রত্যক্ষভাবে 'কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ'-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। 

ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে কবি রফিক আজাদের মানবিক ও প্রতিবাদী চেতনার উত্তরাধিকার বহন করে যেতে চায় এই পর্ষদ। আগামীতে নিজেদের কর্মকাণ্ড আরো বিস্তৃত করে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনের জন্য কাজ করে যাওয়াই এর অভীষ্ট।

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন: