• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

আর্থিক প্রতিকূলতা জয় করে জাতীয় ব্যাডমিন্টনে চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা পোদ্দার

মাহফুজুল ইসলাম, যবিপ্রবি

প্রকাশিত: ১১:০৭, ১ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১১:০৭, ১ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
আর্থিক প্রতিকূলতা জয় করে জাতীয় ব্যাডমিন্টনে চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা পোদ্দার

এক হাতে ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট, অন্য হাতে পরিবারের দায়িত্ব। জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার। ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে প্রথম সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। তবে এই শিরোপা কেবল একটি জয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, পরিবারের স্বপ্ন এবং নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের প্রতিফলন।

মোংলা থেকে উঠে আসা ২৪ বছর বয়সী লিকার এই অর্জনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা লিকার বাবা একজন সাধারণ মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে চার সদস্যের সংসার। বাবা-মা ও দুই বোনের এই পরিবারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বের একটি বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে লিকাকে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি।

সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন দেখা গেছে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের কোর্টে। নারী এককের ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাটলার উর্মি আক্তার। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রথম সেট ২২-২০ ব্যবধানে জিতে এগিয়ে যান লিকা। দ্বিতীয় সেটে ১১-২১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়লেও শেষ সেটে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২১-১৮ পয়েন্টে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে খেলা লিকার হাতে ওঠে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা।

২০১৯ সালে মোংলায় ব্যাডমিন্টন খেলার মধ্য দিয়ে লিকার খেলোয়াড়ি জীবনের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুষ্টের তত্ত্বাবধানে অনুশীলন চালিয়ে যান তিনি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরপরই নিজের এই সাফল্যের জন্য কোচের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন লিকা। পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরের ‘এলোরা শাটলার একাডেমি’তে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটি লিকার জন্য ছিল আবেগে ভরা। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মোংলায় থাকা মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি। আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। মেয়েকে নিয়ে বড় কিছু দেখার স্বপ্ন মায়ের দীর্ঘদিনের। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় ফাইনালের চাপ সামলে শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে মায়ের সেই স্বপ্নেরই যেন এক ধাপ পূরণ করলেন লিকা।

জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াব্যবস্থা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন লিকা। তিনি বলেন, যবিপ্রবিতে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের ধারাবাহিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি। দক্ষ কোচ যুক্ত হলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের পারফরম্যান্সের উন্নতি ঘটানোর সুযোগ পাবেন এবং জাতীয় পর্যায়ে আরও ভালো ফল অর্জন করতে পারবেন।

একই সঙ্গে খেলাধুলার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন এই শাটলার। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও নিয়মিত অনুশীলনের ব্যস্ততার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। ফলে অনেক সময় পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা রাখা হলে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে লিকা বলেন, “জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার মূল লক্ষ্য নিজের এই পারফরম্যান্স ধরে রাখা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। দেশের হয়ে খেলে বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে আনাই এখন আমার স্বপ্ন।”

অভাব-অনটনের সংসার থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ শিরোপা জয় করেছেন লিকা। চ্যাম্পিয়ন হয়ে এলাকায় ফেরার পর তাকে ঘিরে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। তার এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তাকে। তাদের এমন ভালোবাসা ও সংবর্ধনায় লিকার অর্জন পায় এক ভিন্ন মাত্রা। ব্যাডমিন্টন কোর্টে তার এই জয় সামনে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাবে।

মন্তব্য করুন: