• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫০০ বছরের পুঁথিসহ শরীফের ‘ওল্ড কালেকশনে’ আছে দুর্লভ সব সংগ্রহ

নাছিম খান, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯:৫৩, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ

পুরোনো বইয়ের পাতা, হারিয়ে যাওয়া পত্রিকা, একসময় মানুষের নিত্যদিনের ব্যবহারের নানা সামগ্রী, সবকিছুই যেন সময়ের সাক্ষী। কিশোরগঞ্জ শহরে ব্যক্তি উদ্যোগে এমনই এক সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন শরীফুল ইসলাম। যেখানে রয়েছে ৫০০ বছরের প্রাচীন কাগজে হাতে লেখা একটি পুঁথি, পুরোনো বই-পত্রিকার পাশাপাশি আছে টেপ রেকর্ডার, রেডিও, সাদাকালো টেলিভিশন, পুরোনো টেলিফোন, টিকিট, মুদ্রাসহ নানা দুর্লভ সামগ্রী। 

কয়েক দশকের পুরোনো পত্রিকা, শতবর্ষ পেরোনো বই। আবার প্রাচীনকালের মানুষের নিত্যদিনের ব্যবহারের জিনিস, সময় বদলেছে, হারিয়ে গেছে ব্যবহার কিন্তু সেসব স্মৃতি এখনও যত্ন করে ধরে রেখেছেন শরীফুল। কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিম হারুয়া এলাকার এই ছোট্ট সংগ্রহশালার নাম ওল্ড কালেকশন।

শেলফজুড়ে পুরোনো বই আর পত্রিকা। ধুলোমাখা মলাট, পাতায় স্পষ্ট সময়ের ছাপ। এর মাঝেই আলাদা করে চোখে পড়ে ৫০০ বছরের প্রাচীন তুলট কাগজে হাতে লেখা একটি পুঁথি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বোধোদয়, পুরোনো পাঠ্যবই আমার সাথী, মুক্তাহার, জয়গান, এমন নানা দুর্লভ বই রয়েছে এখানে। 

শুধু বই আর পত্রিকা নয়। এই সংগ্রহশালায় ঢুকলে চোখে পড়ে একসময়কার পরিচিত, এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়া নানা জিনিস। টেপ রেকর্ডার, রেডিও, পুরোনো কম্পিউটার, ক্যাসেট প্লেয়ার, টেলিফোন সেট, সাদাকালো টিভি, পাম্প লাইট, ব্রিটিশ আমলের ট্রাংক, আছে আরও অনেক কিছু।

সময়কে ধরে রাখার এই সংগ্রহে জায়গা পেয়েছে টাকাও। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ছাপা বাংলাদেশের পুরোনো নোট, যেগুলোর কিছু কিছু এখন আর প্রচলনে নেই, সেগুলোও জমিয়ে রেখেছেন তিনি।

এই সংগ্রহের পেছনে আছে পারিবারিক একটি গল্প। ছোটবেলায় বাবাকে প্রয়োজনীয় জিনিস বছরের পর বছর যত্ন করে রেখে দিতে দেখেছেন শরীফ। সেখান থেকেই পুরোনো জিনিস ধরে রাখার প্রতি তৈরি হয় তাঁর আগ্রহ। 

প্রাচীন এসব জিনিস উদ্ধার অভিযান কখনো কখনো ছিল বেশ কষ্টের। রাজশাহী অঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে স্যাঁতসেঁতে হয়ে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বই সংগ্রহ করেছিলেন শরীফ। হাত দিলেই ভেঙে পড়ছিল পাতাগুলো। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন কিছু দুর্লভ বই। যা হাতে পাওয়ার আনন্দই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

তবে সবকিছু নিজের কাছে রেখে দেন না শরীফ। একই জিনিস একাধিক কপি থাকলে কিংবা নিজের সংগ্রহশালার জন্য প্রয়োজনীয় মনে না হলে তা বিক্রি করেন। আবার এমন কিছু আছে, যার দ্বিতীয় কপি পাওয়া যাবে কি না, নিশ্চিত নয়। সেগুলো কোনো মূল্যেই বিক্রি করতে চান না। এমনই এক সংগ্রহ ছিল ১৯৭১ সালের একটি পত্রিকা। এক প্রবাসী সংগ্রাহকের প্রয়োজন থাকায় শেষ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকায় সেটি বিক্রি করেন শরীফ। 

শরীফের এসব পুরোনো বই-পত্রিকার পাতায় নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গল্প খুঁজে পান দর্শনার্থীরাও। কারও কাছে আবার পুরোনো পত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছে দেশের অতীত জানার সুযোগ।

তবে এত বড় সংগ্রহ ধরে রাখা সহজ নয়। নিজের আয়ের চেয়ে এই সংগ্রহের পেছনে বেশি খরচ করতে হয়। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বই ও কাগজ অযত্নে নষ্টও হয়ে যাচ্ছে।

তারপরও থামতে চান না শরীফ। কারণ তাঁর কাছে এগুলো শুধু পুরোনো বই কিংবা ফেলে দেওয়া জিনিস নয়, প্রতিটি সংগ্রহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো সময়ের স্মৃতি।

সময়ের স্রোতে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন, হারিয়ে গেছে অনেক জিনিস। তবু পুরোনো বইয়ের পাতা, একটি পত্রিকা কিংবা অচল হয়ে যাওয়া কোনো যন্ত্রের ভেতর আটকে থাকা সেই সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন শরীফুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জের এই ছোট্ট সংগ্রহশালা তাই তাঁর কাছে শুধু পুরোনো জিনিসের ভাণ্ডার নয়, সময়কে ধরে রাখার এক ব্যক্তিগত প্রয়াস।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত