দৈনিক ধরা পড়ছে ২৫০-এর বেশি মশা!
ডেঙ্গুবাহী এডিস মশাকে ডিম পাড়ার পরিবেশ করে দিতে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিশেষ পাত্র বসিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। যেখানে ডিম পাড়তে এসে আটকে যাচ্ছে মা মশা ও লার্ভা দুটোই। মূলত এটি একটি মশা ধরার ফাঁদ।
‘সেন্টিনাল ট্র্যাপ’ নামের আরেকটি বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়েছে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে। যেটি এক ধরনের ফেরোমন নিঃসরণ করে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে মশাদের। রক্তের নেশায় এগিয়ে আসা মশাকে একপর্যায়ে নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে আটকে ফেলে জালে। এভাবে প্রতিদিন এই ফাঁদে আটকে যায় অসংখ্য মশা।
সম্প্রতি দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। ঝরছে অসংখ্য প্রাণ। চিকিৎসা তৎপরতার পাশাপাশি এই রোগের বাহক মশা নিয়ন্ত্রণে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু ব্যাপকভাবে ফগিং করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মশার বিস্তার। ঠিক এই সময়ে ধোঁয়া দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণচেষ্টার বিপরীতে মশাকে ফাঁদে আটকে মারার এই দুই প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।

দুইটি প্রযুক্তির আটটি করে সোহরাওয়ার্দী ও শিশু হাসপাতালে ১৬টি ট্র্যাপ স্থাপন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সংস্থাটি বলছে, নিয়মিত এই মশা ও লার্ভা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা। যার মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ল্যাবে নিয়ে চলে গবেষণাও।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যান ও কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আসিফ ইকবাল বাংলাভিশনকে বলেন, ‘আমরা দুই ধরনের ট্র্যাপ বসিয়েছি। এডাল্ট মশার ট্র্যাপ ও লার্ভার ট্র্যাপ—দুইটা দুই ধরনের কাজ করে। এডাল্ট মশার জন্য সেন্টিনাল ট্র্যাপে আমরা একটা ফেরোমন ব্যবহার করি। সেটার আকর্ষণে মশা এখানে এসে আটকে যায়। এটাকে আমরা নিয়ে ল্যাব টেস্ট করে দেখি এখানকার মশার ঘনত্ব কেমন, ডেঙ্গু মশা কেমন আছে। এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যকে কাজে লাগিয়ে আমরা মশা নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে পারি।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এস এম ওয়াসিমুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় সোহরাওয়ার্দী ও শিশু হাসপাতালে। এখানে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন বিভিন্ন রোগের আরও হাজার হাজার রোগী। সঙ্গে থাকেন স্বজনরাও। এতে ডেঙ্গু রোগীকে কামড় দেওয়া মশার কামড়ের মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন অন্য রোগীরাও। তাই হাসপাতাল দুটিতে ডেঙ্গু মশাকে ফাঁদে আটকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি স্থাপনে সিটি করপোরেশনের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি জানিয়ে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দাবি, এই প্রযুক্তিতে প্রাথমিকভাবে সফলতা পাচ্ছেন তারা। শিগগিরই ঢাকার আরও আটটি হাসপাতালে এই ফাঁদ বসানো হবে বলেও জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে বেশ ভালো ফলাফল দেখছি। দৈনিক প্রতিটি ট্র্যাপে ২৫০টির বেশি মশা আটকাচ্ছে। সেই মশাগুলো নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে টেস্ট করে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। এই প্রযুক্তি আমাদেরকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দিয়েছে। স্থাপন এবং মনিটরিংয়ের কাজ করছে আমাদের মশক নিধন কর্মীরা। ফলে এটির জন্য আমাদের বাড়তি কোনো খরচ হচ্ছে না।’
খুব শিগগিরই উত্তর সিটির আওতাধীন ডেঙ্গু চিকিৎসা চালু থাকা ১০টি হাসপাতালে এই প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মাসের গত ১৮ দিনে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৫৩৩ জন মানুষ। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮১ জন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শুধু হাসপাতালেই ৪০ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে পারেন বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা।
বিভি/কেএস/পিএইচ













মন্তব্য করুন: