উচ্চ রক্তচাপ থেকে মিলতে পারে মুক্তি, আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন ওষুধ!
ছবি: ইন্টারনেট
উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত কোটি মানুষের জন্য আশার খবর নিয়ে এসেছে নতুন একটি ওষুধ। চিকিৎসকদের বিস্মিত করে ‘ব্যাক্সড্রোস্ট্যাট’ নামের ওষুধটি উচ্চ রক্তচাপের একটি সাধারণ কারণ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। এমনকি ওষুধটি সেবন বন্ধ করার দুই বছর পরও অনেক রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ উচ্চ রক্তচাপের অন্য ওষুধও আর গ্রহণ করছেন না।
যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের উচ্চ রক্তচাপ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মরিস ব্রাউন এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সত্যিই খুব আশাব্যঞ্জক। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ রোগী সব ধরনের চিকিৎসা বন্ধ করার পরও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখতে পেরেছেন।’
বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। শুধু যুক্তরাজ্যেই এ রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি। আক্রান্তদের ৫ থেকে ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে ছোট ছোট নডিউল বা নিরীহ টিউমারের কারণে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এসব টিউমার থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালডোস্টেরন নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন কিডনিকে শরীরে লবণ ধরে রাখতে সংকেত দেয়, ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়।
এ সমস্যাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘প্রাইমারি অ্যালডোস্টেরনিজম’ নামে পরিচিত। এর প্রচলিত চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি অপসারণ করা। তবে উচ্চ রক্তচাপের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। ফলে অস্ত্রোপচারের পরও সব রোগীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি পুরোপুরি সেরে যায় না।
ব্যাক্সড্রোস্ট্যাট একধরনের ‘অ্যালডোস্টেরন সিনথেজ ইনহিবিটর’ (এএসআই)। এটি রক্তচাপ বাড়ায় এমন অ্যালডোস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ওষুধে নিয়ন্ত্রণে না আসা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের চিকিৎসায় ওষুধটি অনুমোদন পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স (নাইস) ওষুধটির কার্যকারিতা ও ব্যবহার নিয়ে মূল্যায়ন করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় (এনএইচএস) এটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ছোট পরিসরের একটি গবেষণায় ব্যাক্সড্রোস্ট্যাটের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামনে আসে। গবেষণায় ১৪ জন রোগী অংশ নেন, যাদের উচ্চ রক্তচাপ ওষুধটির তিন মাসের পরীক্ষামূলক ব্যবহারে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে তারা ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ওষুধটি গ্রহণ করেন। এরপর ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা দুই বছর পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, ওষুধ বন্ধ করার পরও রোগীদের রক্তচাপ আগের তুলনায় কম রয়েছে। এ গবেষণার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে।
গবেষণায় যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মেসন ফ্রিম্যান বলেন, রোগীদের কেউ কেউ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে বড় পরিসরে আরেকটি গবেষণা চলছে।
তিনি বলেন, ‘যদি এই প্রভাব বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। প্রাথমিকভাবে রোগটির সন্দেহ হলেই সবাইকে এএসআই দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে। যারা ওষুধে ভালো সাড়া দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে জটিল রোগনির্ণয় পদ্ধতি ও অস্ত্রোপচার এড়ানো যেতে পারে।’
অধ্যাপক মরিস ব্রাউনের ধারণা, ব্যাক্সড্রোস্ট্যাট প্রাইমারি অ্যালডোস্টেরনিজম সারিয়ে তুলতে পারে। প্রায় ২০ বছর আগে ইঁদুরের ওপর করা একটি পরীক্ষার ফল থেকে তার এ ধারণার সূত্রপাত। ওই পরীক্ষায় দেখা যায়, অ্যালডোস্টেরন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিন নিষ্ক্রিয় করে দিলে হরমোন উৎপাদনকারী কোষগুলোও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ব্রাউনের ধারণা, ব্যাক্সড্রোস্ট্যাটও একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ওষুধটি অ্যালডোস্টেরনের উৎপাদন কমিয়ে দিলে শরীরে ‘রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস’ নামের অত্যন্ত সক্রিয় অণুর পরিমাণ বেড়ে যায়। এসব অণু অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে বেছে বেছে ধ্বংস করতে পারে।
ব্রাউন বলেন, ‘ওই অক্সিজেন র্যাডিক্যালগুলো কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয় এবং একপর্যায়ে সেগুলো আর থাকে না। আমার ধারণা, এভাবেই ওষুধটি কাজ করে। বিষয়টি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব এবং আমরা এখন পরীক্ষাগারে সেটিই করছি।’
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: