• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

সুয়েজ খালের পর হরমুজ প্রণালি

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতোই কী শেষ হচ্ছে আমেরিকার মোড়লগিরি?

ইমরান মাহমুদ

প্রকাশিত: ০৯:১৫, ৩১ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতোই কী শেষ হচ্ছে আমেরিকার মোড়লগিরি?

সুয়েজ খালকে ঘিরে একসময় যেভাবে পতন ঘটেছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের, তেমনি এবার হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কী শেষ হবে আমেরিকার মোড়লগিরি? বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের হাতে থাকায় কমে গেছে আমেরিকার গুরুত্ব। 

এরইমধ্যে, হরমুজ প্রণালি পরিচালনা ও টোল আদায়ের জন্য 'নতুন ব্যবস্থা' চালুর কথা ভাবছে ইরান। নয়া ব্যবস্থায় ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না, দিতে হবে টোল। তাহলে কি সত্যিই পতন ঘটছে আমেরিকার মোড়লগিরির? 

একসময়কার প্রতাপশালী বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিলো সুয়েজ খালের জন্য! একইভাবে হরমুজ প্রণালী কি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার মোড়লগিড়ির পতন ঘটাতে পারে? আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’র জন্য একই রকম একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ বা Suez Moment হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক। মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরাইল সামরিক শক্তি দিয়ে তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অসহযোগিতার মুখে ব্রিটেনকে অপমানজনকভাবে পিছু হটতে হয়। এই ঘটনাই বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, ব্রিটেনের আধিপত্যের দিন শেষ।

বর্তমানে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালী’কে কেন্দ্র করে ঠিক একই রকম একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইস্তাম্বুলের জাউম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ারস বিভাগের পরিচালক সামি আল আরিয়ান মিডেল ইস্ট আই-কে দেয়া এক মতামতে বলেন, সুয়েজ যেমন ব্রিটেনের পতনের ঘণ্টা বাজিয়েছিল, হরমুজও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে, যার প্রভাব ইতমধ্যেই দেখতে পাচ্ছে বিশ্ব। মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী বর্তমান বিশ্বের নতুন ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। কিন্তু ইরান এখন এই অঞ্চলে এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পলিসি ম্যাগাজিন-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটেন বুঝতে পারেনি যে শক্তির ভারসাম্য লন্ডন থেকে সরে ওয়াশিংটনের দিকে চলে গেছে। একইভাবে ওয়াশিংটনও হয়তো বুঝতে পারছে না যে বিশ্ব এখন বহুমুখী বা Multipolar হয়ে উঠছে। চীন, রাশিয়া এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।

সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটেন তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রও বিশাল ঋণের বোঝা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনে জর্জরিত। লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে হুতি বিদ্রোহী বা ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো বড় ধরনের সামরিক পরাজয় বা কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হয়, তবে তা হবে তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবসানের সংকেত।

ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করে, তবে ভিন্ন রূপে। সুয়েজ খাল ব্রিটেনের জন্য ছিল আত্মমর্যাদার লড়াই, যেখানে তারা পরাজিত হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল তেলের সরবরাহ নয়, বরং তাদের ডলারের আধিপত্য এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পরীক্ষা। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে হরমুজ হবে মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, আর হরমুজ প্রণালী এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন কি ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করবে, নাকি লন্ডনের মতোই এক অনিবার্য পতনের দিকে এগিয়ে যাবে।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত