হেরোইনের চেয়েও শত গুণ শক্তিশালী, স্কটল্যান্ডে সিনথেটিক মাদক নিয়ে আতঙ্ক!
স্কটল্যান্ডে মাদকজনিত মৃত্যুর উচ্চ হার কমাতে নানা উদ্যোগের মধ্যেই দেশটির অবৈধ মাদকের বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে শত শত শক্তিশালী নতুন সিনথেটিক পদার্থ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব নতুন মাদকের বিস্তার চলমান সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে এবং প্রাণঘাতী মাত্রাতিরিক্ত সেবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত তিন বছরে স্কটল্যান্ডে নতুন ধরনের সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড ও ওপিওয়েডের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে বদলে গেছে অবৈধ মাদকের বাজার। আগামী বুধবার প্রকাশিতব্য বার্ষিক পরিসংখ্যানে দেশটিতে মাদকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ইউরোপে মাদকজনিত মৃত্যুর হারের দিক থেকে স্কটল্যান্ডের অবস্থান সবচেয়ে খারাপগুলোর মধ্যে রয়েছে।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক সায়েন্সবিষয়ক লেভারহাল্ম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক ডা. লর্না নিসবেট বলেন, স্কটল্যান্ডে অবৈধ মাদকের সরবরাহ ক্রমেই আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। হেরোইন বা কোকেনের মতো চাষ করা উদ্ভিদ থেকে এসব নতুন মাদক তৈরি হয় না। বরং অনেক নতুন সিনথেটিক পদার্থ গোপন গবেষণাগারে তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে নাইটাজিন ও অরফিনের মতো সিনথেটিক ওপিওয়েড রয়েছে, যার কিছু হেরোইনের চেয়ে শত গুণ বেশি শক্তিশালী।
পুলিশ বলছে, মুনাফা বাড়াতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো বিদ্যমান মাদকের সঙ্গে এসব নতুন পদার্থ মিশিয়ে দিচ্ছে। পুলিশ স্কটল্যান্ডের সুপারিনটেনডেন্ট নিভেন বুল বলেন, এসব অপরাধী চক্র মানুষের দুর্দশা থেকে মুনাফা করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ড্রাগস এজেন্সির (ইউডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গড়ে প্রতি সপ্তাহে একটি করে নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের আবির্ভাব হয়েছে। সংস্থাটির মতে, চীনে মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়া এবং আফগানিস্তানে তালেবানের আফিম চাষ নিষিদ্ধ করার কারণে উৎপাদন এখন ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি চলে আসছে।
স্কটল্যান্ডেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গত ১৪ মাসে পুলিশ নাইটাজিন তৈরির সন্দেহে দুটি স্থাপনায় অভিযান চালিয়েছে। এসব ঘটনায় মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আয়ারশায়ারের পাতনায় একটি সন্দেহভাজন অবৈধ মাদক গবেষণাগার শনাক্ত করে পুলিশ। পরে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাজ্যে সন্দেহভাজন প্রথম নাইটাজিন গবেষণাগার।
বিবিসি জানতে পেরেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিদলোথিয়ানের লোনহেডে একটি ইউনিটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৩ ও ৫৬ বছর বয়সী দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিনথেটিক ওপিওয়েড তৈরির আরেকটি সন্দেহভাজন গবেষণাগার নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে এ অভিযান চালানো হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে স্কটল্যান্ডে ৭৬টি মাদকজনিত মৃত্যুর ঘটনায় নাইটাজিনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি।
ডা. নিসবেট বলেন, এসব মাদক অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বিজ্ঞানীদের জন্যও এগুলোর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর গবেষণাগার শিগগিরই স্কটল্যান্ডের জাতীয় মাদক পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে আরও বিস্তৃত দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।
নতুন নতুন মাদক শনাক্ত করে দ্রুত নিষিদ্ধ করাও আইনপ্রণেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউডিএ বলছে, আইনি নিয়ন্ত্রণ এড়াতে প্রতিনিয়ত নতুন ও ক্ষতিকর পদার্থ তৈরি করা হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের আইন যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন হলেও জনস্বাস্থ্য, পুলিশিং ও বিচারসংক্রান্ত বেশ কিছু দায়িত্ব স্কটিশ সরকারের হাতে রয়েছে।
মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাও নতুন সিনথেটিক ওপিওয়েডের ভয়াবহ প্রভাব দেখতে পাচ্ছে। মাদক, অ্যালকোহল ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘উইথ ইউ’-এর জাতীয় ক্ষতি কমানোবিষয়ক প্রধান গ্যারেথ বালমার বলেন, নাইটাজিনসহ নতুন সিনথেটিক ওপিওয়েড এখন বেঞ্জোডায়াজেপিন, ‘স্পাইস’ নামে পরিচিত সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড, কোকেন ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের সরবরাহে পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি একটি ভয়ংকর নতুন বাস্তবতা। তার মতে, বর্তমানে মাদক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এসব পদার্থের অতিরিক্ত শক্তির কারণে অনেক ব্যবহারকারী অপ্রত্যাশিত ও গুরুতর মাত্রাতিরিক্ত সেবনের শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থায় ওপিওয়েডের অতিরিক্ত মাত্রার প্রভাব প্রতিহত করতে সক্ষম ওষুধ নালোক্সোন সহজলভ্য করা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ স্কটল্যান্ড জানিয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর পাশাপাশি আসক্তদের সহায়তাও করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে পুলিশ প্রায় ৮ কোটি পাউন্ড মূল্যের অবৈধ মাদক জব্দ করেছে। চলতি বছরেই এখন পর্যন্ত জব্দ করা মাদকের মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়াম ডি ডেইড বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার জাতীয় মাদক পরীক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে সম্প্রসারিত হলে দ্রুত মাদকের নমুনা পরীক্ষা করে ব্যবহারকারীদের প্রায় তাৎক্ষণিক তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফল সরকারি নীতিনির্ধারণেও সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, মাদকের ধরন সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নমুনায় কী ধরনের পদার্থ রয়েছে তা জানা না গেলে ব্যবহারকারীদের সঠিক পরামর্শ দেওয়াও কঠিন।
কিন্টায়ারে মাদক ও অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা ভিকি গ্যাম্বলও নতুন মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর আশঙ্কা, তরুণদের অনেকে কী ধরনের পদার্থ গ্রহণ করছে, সেটিই হয়তো তারা নিজেরাও জানে না।
‘উইথ ইউ’-এর গ্যারেথ বালমারের মতে, এই অনিশ্চয়তাই নতুন মাদকগুলোর সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: