গাজায় বই হাতে আবার ক্লাসে শিশুরা, মাটিতেই বসছে পাঠশালা!
ইসরাইলি হামলার আতঙ্ক আর যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যেই গাজার বিভিন্ন এলাকায় আবারও স্কুলমুখী হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজা উপত্যকাজুড়ে প্রায় ৭০০টি তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। এসব তাঁবুতে ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হবে। আনাদোলু এজেন্সির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।
গাজার অধিকাংশ স্থায়ী স্কুল ভবনই ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার বহু অক্ষত স্কুল পরিণত হয়েছে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারের শরণার্থী শিবিরে। ফলে ধ্বংসস্তূপের মাঝে খোলা জায়গায়, পলিথিনের তাঁবুতে কিংবা অর্ধেক ভেঙে পড়া ভবনের নিচে সাময়িকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ভাঙা ইট-পাথর সরিয়ে মাটিতে বসেই ক্লাস করছে অনেক শিশু।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও অব্যাহত অবরোধ ও সামরিক হামলার কারণে গাজাজুড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকেরা। শিক্ষিকা রাজা আল নাহবিন বলেন, ''যুদ্ধের আগে আমাদের প্রয়োজনীয় সব কিছুই ছিল। বসার জায়গা, পাঠ্যবই এবং লেখার সরঞ্জাম ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর আজ আমাদের সেই সাধারণ জিনিসগুলোরও অভাব দেখা দিয়েছে। বসার জায়গা নেই, লেখার সরঞ্জাম নেই, এমনকি পাঠ্যবইও নেই। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমাদের অনেক কিছুর প্রয়োজন।''
দীর্ঘদিন ধরে বই-খাতা ও সহপাঠীদের থেকে দূরে থাকা এই শিশুদের মানসিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রায় প্রতিটি শিশুই যুদ্ধ, প্রিয়জন বা সহপাঠী হারানো এবং বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার মতো ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে। তাই এই শ্রেণিকক্ষগুলো শুধু পড়াশোনার কেন্দ্র নয়; বরং এগুলো তাদের জন্য এক ধরনের 'মনস্তাত্ত্বিক নিরাময় কেন্দ্র'।
গাজার একটি স্কুলের ছাত্র মোয়াইদ আল মোস্তফা বলেন, ''শেষবার আমি স্কুলে গিয়েছিলাম তিন বছর আগে। এখন আমরা নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করছি। এটি আমাদের জন্য আনন্দ ও সাফল্যের বছর। আমরা তাঁবুর নিচে পড়াশোনা করছি। এখানে বাতাস চলাচলের ভালো ব্যবস্থা বা বসার জন্য চেয়ার-টেবিল নেই, আমাদের মাদুরে বসতে হচ্ছে—তবুও আমরা শিখছি। এখানে আমরা একা, কারণ যুদ্ধের সময় আমরা আমাদের বন্ধুদের হারিয়েছি। আমাদের কিছুই নেই—ভালো পোশাক নেই, এমনকি ভালো জুতোও নেই। যুদ্ধের আগে লেখার সরঞ্জামের দাম কম ছিল, এখন তা অনেক বেশি। আমাদের কাছে খাতা-পেন্সিল বা স্কুল সম্পর্কিত কিছুই নেই। এসব সত্ত্বেও আমরা শিখব; তাঁবুর নিচে বসেই আমরা পড়াশোনা চালিয়ে যাব।''
ইউনিসেফ-এর হিসাবে, গাজায় প্রায় ৬ লাখ ৫৮ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় গাজা ও পশ্চিম তীর মিলিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার শিশুকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অবকাঠামো পুনর্গঠন, নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি এবং শিক্ষক সংকট সমাধান—সব মিলিয়ে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভি/এমএফআর













মন্তব্য করুন: