অবশেষে সরানো হলো ৬০০ বছরের প্রাচীন সেই মসজিদের একাংশ!
ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ২০২৮ সালের হিন্দু তীর্থযাত্রা সিমহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে শাহি মসজিদের একাংশ অপসারণ নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় মসজিদের যে অংশ পড়েছে, সেটি সরানোর উদ্যোগ নেয় স্থানীয় প্রশাসন। এ নিয়ে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হলে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রবিবার রাতে মসজিদের একাংশ ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় শত শত মুসলিম সেখানে অবস্থান নেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত ও কয়েকজন আটকের কথা জানানো হয়েছে।
জানা যায়, উজ্জয়িনী মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শহরটিতে ২০২৮ সালে ক্ষিপ্রা নদীর তীরে সিমহস্থ কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। প্রতি ১২ বছর পর অনুষ্ঠিত এ তীর্থযাত্রায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়।
২০২৮ সালের সিমহস্থ কুম্ভ মেলাকে সামনে রেখে উজ্জয়িনীর বিভিন্ন সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর চলাচল ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার জন্য সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন। শাহি মসজিদের যে অংশটি প্রস্তাবিত সড়কের মধ্যে পড়েছে, সেটিও এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দাবি, প্রায় দুই মাস আগে উজ্জয়িনী পৌর করপোরেশন তাদের নোটিশ দিয়ে জানায়, সড়ক প্রশস্ত করার জন্য মসজিদের সংশ্লিষ্ট অংশ সরাতে হবে।
উজ্জয়িনীর বাসিন্দা ও ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবসায়ী জিশান খান আল জাজিরাকে বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মসজিদের সংশ্লিষ্ট অংশ নিজেদের উদ্যোগে সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা দিয়েছিল। তা না হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে বলেও জানানো হয়।
মসজিদের অংশ অপসারণ বন্ধ করতে স্থানীয় মুসলিমরা আদালতেরও দ্বারস্থ হন। তবে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট তাদের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট অংশ সরানোর ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেনি। আদালতের নথিতে সিমহস্থ কুম্ভ মেলার সময় যানবাহন চলাচল, জননিরাপত্তা ও জনসাধারণের সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করে। পরে সড়কের দিক থেকে মসজিদের সাত ফুটের বেশি অংশ সরানোর পরিবর্তে প্রায় তিন ফুট অংশ অপসারণের বিষয়ে সমঝোতা হয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত মসজিদের সংশ্লিষ্ট অংশের কিছুটা নিজেরাই সরিয়ে নেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন।
তবে রবিবার রাতে মসজিদের কাছে বুলডোজার আনা হলে ছত্রি চৌকে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। কর্তৃপক্ষের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কিছু বিভ্রান্তিকর ছবি ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর মসজিদটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে রাতভর বিক্ষোভ হয়। জিশান খান বলেন, প্রশাসন এলাকাটি ঘিরে ফেলে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনকে জানায়, হয় তারা নিজেরাই মসজিদের সংশ্লিষ্ট অংশ সরিয়ে নেবেন, নয়তো প্রশাসন তা সরিয়ে দেবে।
সোমবার সকালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়।
এরপর মসজিদে সরাসরি বুলডোজার অভিযান চালানোর আশঙ্কা তৈরি হলে মসজিদ কমিটি নিজেরাই স্থাপনার একটি অংশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েক ডজন মুসলিম ব্যক্তি হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে মসজিদের পাশের প্ল্যাটফর্মের অংশ সরিয়ে নেন। জিশান খান বলেন, ‘আমরা নিজেদের হাতেই এটি ভেঙেছি। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে।’
জিশান খানের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষ মসজিদের একটি মিনারের অংশও সরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, মিনারের অংশ অপসারণের কাজ শুরু হলেও মসজিদের ভেতরের অংশে তখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি। উজ্জয়িনী প্রশাসন শাহি মসজিদের আশপাশের এলাকা ঘিরে দিয়েছে এবং সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
এদিকে, উজ্জয়িনীর পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার মধ্যেই মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি মুসলিম সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় ভাঙার বিরুদ্ধে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে কয়েকজন মুসলিম সংসদ সদস্য ও ধর্মীয় নেতা অংশ নেন।
ইন্ডিয়ান মুসলিমসের মনিটরিং কমিটির আয়োজিত ওই বিক্ষোভে জামায়াতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি বলেন, বিষয়টি শুধু একটি মসজিদ বা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
মধ্যপ্রদেশের বিজেপির দুই মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা আল জাজিরার ফোনের জবাব দেননি। নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা আল জাজিরাকে বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে অনেক মুসলিম এসব স্থাপনা অপসারণের ঘটনাকে যুক্ত করছেন।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য, মসজিদ নিয়ে বিভিন্ন প্রচারণা, মাদ্রাসার ওপর চাপ এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বিরোধ- সবকিছুর সঙ্গে এসব স্থাপনা অপসারণের ঘটনাকে মানুষ মিলিয়ে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘মানুষ মনে করছে, তাদের ইতিহাস শহর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।’ তবে কর্তৃপক্ষ ও আদালতের নথি অনুযায়ী, উজ্জয়িনীর শাহি মসজিদ পুরোপুরি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; প্রস্তাবিত সড়ক প্রশস্তকরণের আওতায় পড়া অংশই অপসারণের বিষয়টি আদালতে বিবেচিত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: