• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বাস চালকের মেয়ের নোবেল জয়: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড়

বাসস

প্রকাশিত: ১৪:০৬, ১০ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
বাস চালকের মেয়ের নোবেল জয়: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড়

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই পুরস্কার প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় তিনি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি কটাক্ষ করেন এবং এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনার মুখোমুখি হন।

পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর জার্মানির নুরেমবার্গের ঐতিহাসিক আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে ৮৫ বছর বয়সী এই বিচারক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাকে ইঙ্গিত করে সূক্ষ্ম রসিকতা করেন। পিল্লাই হাসতে হাসতে বলেন, 'আপনারা যদি আরেকটু জোরে হাততালি দেন, তবে আমি এই পুরস্কারটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ভাগ করে নিতে পারি।' তাঁর এই বুদ্ধিদীপ্ত কটাক্ষ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে পিল্লাইয়ের এই নোবেল জয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। গত বছর নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে স্পষ্ট ভাষায় 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। এর জেরে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরস্কারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে "ইসরাইলবিরোধী ঘৃণা ও কুসংস্কারকে বৈধতা দেওয়ার একটি কিম্ভূত অস্ত্র" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ নাভি পিল্লাইকে "আমেরিকা ও ইসরাইল বিদ্বেষী" বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন। এই নোবেল ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় মার্কিন প্রশাসন নাভি পিল্লাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিলে বৈশ্বিক কূটনৈতিক উত্তেজনা চরম রূপ ধারণ করে।

শৈশব ও বর্ণবাদের ঘোর অন্ধকার:
নাভি পিল্লাই (পুরো নাম: নাভানেথেম পিল্লাই) ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরের ক্লেয়ারউড বস্তির এক দরিদ্র তামিল অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা মূলত অবিভক্ত ভারতের তামিলনাড়ু থেকে ১৯ শতকের শেষভাগে চুক্তিবদ্ধ দাস-শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আখের খামারে কাজ করতে এসেছিলেন।

পিল্লাইয়ের বাবা ছিলেন সাধারণ একজন বাস চালক। সংসারে ছিল তীব্র অভাব-অনটন আর সাত ভাইবোনের ভিড়। বর্ণবাদের ঘোর অন্ধকারে এমন এক পরিবারে তিনি বড় হয়েছেন, যেখানে কোনো বই বা খবরের কাগজ ছিল না।

নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও পিল্লাইয়ের দরিদ্র বাবার পক্ষে খরচ চালানো অসম্ভব ছিল। তখন তাঁর ক্লেয়ারউড বস্তির স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরা চাঁদা তুলে এবং চার্চ থেকে একটি ছোট স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে তাঁর পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছিল। সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা টপকে তিনি শিক্ষার প্রতি অনড় থাকেন এবং নাটাল প্রদেশের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব ল ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।

ল ফার্ম খোলার পর শ্বেতাঙ্গ বিচারকরা প্রায়ই তাঁকে এজলাসে দেখে অবজ্ঞা করে বলতেন, "তুমি কে? কাঠগড়ার আসামি নাকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী?" এমন অপমানের মুখেও তিনি পিছপা হননি। পরবর্তীতে তিনি প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

নেলসন ম্যান্ডেলার অধিকার আদায়ের লড়াইড়াই:
আইনজীবী হিসেবে নাভি পিল্লাইয়ের মূল লড়াই শুরু হয়েছিল বর্ণবাদী আফ্রিকানার সরকারের বিরুদ্ধে। রোবেন দ্বীপে বন্দী থাকা কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলসহ শত শত বিপ্লবীর পক্ষে আদালতে লড়েছেন তিনি। পিল্লাই সাহসের সাথে আইনি লড়াই করে ১৯৭৩ সালে ওই কারাগারে বন্দীদের জন্য আইনজীবীর প্রবেশাধিকারের ঐতিহাসিক অধিকার আদায় করেন।

এ সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় 'উইমেন টুওয়ার্ডস পিস' নামক একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে বর্ণবাদী পুলিশের হাতে নির্যাতিত ও গুম হওয়া কৃষ্ণাঙ্গ তরুণদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হতো। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটার পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ১৯৯৫ সালে নাভি পিল্লাইকে দেশটির হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক নিযুক্ত করেন।

বিশ্ব ইতিহাস বদলে দেওয়া রায়:
ম্যান্ডেলার সুপারিশেই নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের রুয়ান্ডা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটিআর) বিচারক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে এর প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯০-এর দশকের রুয়ান্ডা গণহত্যার মামলা পরিচালনাকালে তিনি এক যুগান্তকারী নজির স্থাপন করেন। তাঁর ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমেই বিশ্ব আইনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো 'ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা'কে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯৯৮ সালে রোম চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যখন হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরি হচ্ছিল, তখন পিল্লাই সেখানে লিঙ্গ সমতার অধিকার নিয়ে জোরালো ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তীতে এই আদালতের অন্যতম প্রধান বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

জাতিসংঘের শীর্ষ পদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত:
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। সিরিয়া, লিবিয়া কিংবা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ—বিশ্বের যেখানেই পরাশক্তিরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, সেখানেই তিনি সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।

৮৫ বছর বয়সেও অনড় বর্তমান:
৮৫ বছর বয়সে এসেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার নাভি পিল্লাই বর্তমানে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিশেষ বিচারক হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে, তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত বছর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়।

জীবনের শেষভাগে এসেও তাঁর এই অবিরাম লড়াই নিয়ে নাভি পিল্লাই বলেন, 'ন্যায়বিচার কোনো দান নয়, এটি মানুষের জন্মগত অধিকার। আর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বয়সের কোনো সীমা থাকে না।' এই আন্তর্জাতিক আইনি অবদান এবং দীর্ঘ সংগ্রামের ফলেই ২০২৬ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন: