ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
লুলার ঐতিহাসিক জয়ে উল্লাস, ফল মানতে নারাজ বলসোনারো
চরম ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। শতভাগ ভোট গণনা শেষে ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন ৮০ বছর বয়সী লুলা। এর মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে রয়েছেন তিনি। তবে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ তার বিজয় নিশ্চিত করার পরও পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলসোনারো। নির্বাচনের ফল বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শতভাগ ভোট গণনা শেষে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ।
রবিবারের (২৫ অক্টোবর) এই জয়ের মধ্য দিয়ে প্রথম দফার নির্বাচনে পিছিয়ে পড়ার পরও দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়ার নজির গড়েছেন লুলা। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকা কোনো প্রার্থীর দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।
অক্টোবরের শুরুর দিকে প্রথম দফার ভোটে বলসোনারোর কাছে অল্প ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছিলেন লুলা। এতে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। হতাশায় পড়েন দেশটির প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থকেরা। তবে কয়েক সপ্তাহের সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দ্বিতীয় দফার ভোটে জয় ছিনিয়ে নেন লুলা।
বিজয় ঘোষণার পর সাও পাওলোর রাস্তায় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তার সমর্থকেরা। নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা একটি সম্মেলনকেন্দ্রেও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়।
সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা বলেন, ‘আমরা এই দেশ পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। এই নির্বাচন ছিল অস্বীকারবাদী রাজনীতির পরাজয়। আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, এই দেশের নারী-পুরুষ সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। গণতন্ত্রের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।’
লুলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলেকজান্দ্রে পাদিলহা বলেন, ‘এটি ব্রাজিলের জনগণের জন্য বিশাল বিজয়। দ্বিতীয় দফার ভোটে তারা ভেবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, প্রেসিডেন্ট লুলা পরিবেশ, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং ব্রাজিলের সংবিধান রক্ষার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে চরম ডানপন্থী প্রার্থীর কারণে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটিও তারা বিবেচনা করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি বিশাল বিজয়—শুধু ব্রাজিলের জন্য নয়। লাতিন আমেরিকার বাকি দেশগুলোর পাশাপাশি সারা বিশ্বের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।’
প্রথম দফার নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার হার ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা ছিল রেকর্ড। লুলার মিত্রদের ধারণা ছিল, ভোটারদের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে পারলে ব্যবধান কমানো সম্ভব হবে। দ্বিতীয় দফায় ভোট না দেওয়ার হার কমে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ২১ শতাংশে।
লুলার বিজয় ভাষণের সময় বলসোনারো বলেন, নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া ‘অসম্ভব’। তার আইনি দল নির্বাচনের ফল বাতিলের জন্য আবেদন করবে বলেও জানান তিনি।

চার বছর আগে তার বাবা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোও লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। এবার ছেলের পরাজয়ের পরও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেল।
বলসোনারো ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিনের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ওই বিচারপতি ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বলসোনারোর ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত ‘স্বাভাবিক ছিল না, গ্রহণযোগ্যও ছিল না’। তার দাবি, খেলা চলার সময় নিয়ম পরিবর্তন করার মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি, তার নিজের নির্বাচনী শিবিরও ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর জন্য নির্বাচনী আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিল।
আগামী মঙ্গলবার ৮১ বছরে পা দিতে যাওয়া লুলার এই জয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকনেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে।
দারিদ্র্যের মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় জন্ম নেওয়া সাবেক এই কারখানাশ্রমিক ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। অবশেষে ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ব্রাজিলের প্রথম নির্বাচিত শ্রমিকশ্রেণির প্রেসিডেন্ট হন তিনি।
সংবিধান অনুযায়ী টানা দুই মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়েন লুলা। পরে ২০২২ সালের নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জাইর বলসোনারো কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
লুলার এবারের জয় জাইর বলসোনারোর জন্যও বড় ধাক্কা। ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টার ঘটনায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি। ছেলে ফ্লাভিও নির্বাচনে জয়ী হলে মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি সরকারে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন বলে আশা করেছিলেন জাইর।

লুলার বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বলসোনারো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র ট্রাম্প আশা করেছিলেন, ফ্লাভিও জয়ী হলে লাতিন আমেরিকায় তার ঘনিষ্ঠ নেতাদের প্রভাব আরও বাড়বে।
এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাজনীতিকদের উত্থান ঘটেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কলম্বিয়ার আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা, ইকুয়েডরের ড্যানিয়েল নোবোয়া, চিলির হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মিলেই।
অন্যদিকে লুলার বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন লাতিন আমেরিকার কয়েকজন নেতা। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম বলেন, ‘গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক, ব্রাজিলের জনগণ জয়ী হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট লুলাকে অভিনন্দন।’
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা বলেন, ‘এই মহান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য আমি ব্রাজিলের জনগণকে অভিনন্দন জানাই।’
নির্বাচনের আগের দিন শনিবার লুলার সমর্থকেরা বড় দুটি সমাবেশ করেন। রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সমুদ্রসৈকতে জড়ো হন ১০ লাখের বেশি মানুষ। অন্যদিকে সাও পাওলোর পাউলিস্তা অ্যাভিনিউতে সমবেত হন আরও বেশি মানুষ।
রবিবার রাতে সাও পাওলোর রাস্তায় উল্লাসের পাশাপাশি বলসোনারোপন্থী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ভোট বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, লুলার সমর্থন বেশি এমন এলাকার গণপরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়া কঠিন করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল।
সাও পাওলোর ৩২ বছর বয়সী জনসংযোগকর্মী লুকাস লোপেস বলেন, ‘আমার মনে হয়, ব্রাজিলে চরম ডানপন্থীরা আবারও অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছে। তবে জিততে হলে আমাদের সত্যিকার অর্থেই লড়াই করতে হবে।’
তবে শেষ পর্যন্ত লুলার বিজয় ঠেকানোর সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে মনে করেন তার সমর্থকেরা।
সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের অভ্যন্তরীণ শহর ফ্রাঙ্কার ৪০ বছর বয়সী আলোকচিত্রী কাইও মার্কেস বলেন, ‘সত্যি বলতে, প্রথম দফায় বামপন্থীরা ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় তারা জেগে উঠেছে। কোনো অভ্যুত্থানই আমাদের এই জয় কেড়ে নিতে পারবে না।’
সাও পাওলোর পাউলিস্তা অ্যাভিনিউতে হাজারো উল্লাসরত মানুষের সঙ্গে যোগ দেওয়া ৩৪ বছর বয়সী আলোকচিত্রী মাইকন ডগলাস বেন্তো বলেন, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। এই আনন্দ ধারণ করার মতো জায়গা যেন আমার বুকেও নেই। লুলার বিজয়ের অনেক অর্থ রয়েছে। যারা ভালোবাসা ও জীবনে বিশ্বাস করে, তাদের কাছে এটি জীবনের প্রতীক।’
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: