• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ শর্ত, কোন দাবিতে আটকে আছে সমঝোতা?

প্রকাশিত: ০১:২৪, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০১:২৪, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ শর্ত, কোন দাবিতে আটকে আছে সমঝোতা?

ছবি: খালিজ টাইমস

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা বাড়িয়েছে কাতার। তবে সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে তাদের নির্দিষ্ট কিছু দাবি পূরণ করতে হবে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নিলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এর আগে এ বিষয়ে এক সপ্তাহের সময়সীমার কথা বলেছিল তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দুই দিনের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ইরানের সদিচ্ছারই প্রমাণ। ইরানের দাবিগুলো পূরণ হলে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং অল্প সময়ের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এখনো চলছে বলেও জানান তিনি।

কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো বার্তাও পর্যালোচনা করছেন। তবে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ শর্ত

ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সব শর্তের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ চুক্তি এবং ইরানি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে সাতটি দাবির বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।

১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ

ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে সব ফ্রন্টে লড়াই বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে লেবাননের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে তেহরান। গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিও আগে জানিয়েছে দেশটি, যদিও সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যে গাজার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র এর আগে উদ্যোগ নিয়েছিল। জুনে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তিও হয়। এতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চুক্তির পরও লেবাননে ইসরাইলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

২. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার

যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমা সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান এ আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে এবং বহু নাবিক দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকে পড়েন।

এরপর ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া নৌযানের ওপর অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তবে ইরানের বাইরের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছিল।

জুনে যুদ্ধবিরতির পর ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হলেও ১৫ জুলাই তা আবার কার্যকর করা হয়। ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে রয়েছে দেশটি। ১৯৭৯ সাল থেকে এসব নিষেধাজ্ঞা বিভিন্ন পর্যায়ে আরোপ, সম্প্রসারণ ও পুনর্বহাল করা হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের কারণে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়েছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে নতুন কিছু নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি থাকলেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে সময় নির্ধারণ নিয়ে। ওয়াশিংটন চায়, নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রত্যাহারের আগে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিক। অন্যদিকে, তেহরান যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়।

৪. বিদেশে জব্দ করা সম্পদ ফেরত

বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিদেশে ইরানের ঠিক কত সম্পদ জব্দ রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, জব্দ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের (ইউএসআইপি) উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, এ পরিমাণ ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। অন্য কিছু হিসাব বলছে, বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

কত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, তার পাশাপাশি কখন ও কীভাবে তা দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত আলোচনা শুরুর আগেই সম্পদের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইরান। আলোচনা চলাকালেও ধাপে ধাপে অর্থ ছাড়ের দাবি রয়েছে দেশটির।

৫. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমানোর দাবি জানিয়েছে ইরান। যুদ্ধের আগে এ অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর যে উপস্থিতি ছিল, সেখানে ফিরে যেতে চায় তেহরান। যুদ্ধের সময় বাড়ানো সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী হয়ে উঠুক, তা চায় না দেশটি।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অধীনে জর্ডান থেকে ওমান পর্যন্ত প্রায় ২০টি সামরিক স্থাপনায় আনুমানিক ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পর ওই অঞ্চলে আরও বিমানবাহী রণতরি, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠায় ওয়াশিংটন। ইরান চায়, যুদ্ধ শেষ হলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আবার আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া হোক।

৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ

যুদ্ধে অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চায় ইরান। দেশটির দাবি, দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির বিরোধিতা করেছেন। এর পরিবর্তে তিনি সড়কের পাশে পুঁতে রাখা বোমার কারণে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি এবং ইরানে নিহত বিক্ষোভকারীদের জন্য তেহরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমে মোহাজেরানি ১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা আরআইএ নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন বা ২৭ হাজার কোটি ডলার। তবে এ হিসাবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

৭. ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র আর হামলা চালাবে না- এমন নিশ্চয়তা চায় তেহরান। ইরানের অবস্থান হলো, শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়; যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবার হামলা শুরু হওয়ার আশঙ্কাও দূর করতে হবে।

গত ১ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে। তবে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ৩১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আবার যুদ্ধে না ফেরার বিষয়ে সতর্ক করেন। নতুন করে হামলা হলে ইরানও জবাব দেবে বলে জানিয়েছে তেহরান।

এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সংঘাত আবারও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ জানিয়েছেন, তারা আলোচনায় অগ্রগতি চান, তবে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কার জন্যও প্রস্তুত রয়েছেন।

কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফরের পর ইরানও আরও আলোচনার জন্য কাতারে দূত পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া ঠেকানো।

সূত্র: খালিজ টাইমস

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত