• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ, চাপে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ

প্রকাশিত: ০১:৩৯, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০১:৩৯, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ, চাপে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার বিভাগ দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সুবিধার্থে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ এড়াতে কয়েক দশক ধরে চলে আসা রীতি থেকে সরে এসেছে বিভাগটি। ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কায় নির্বাচনী বিরোধে বিচার বিভাগের পদক্ষেপ ঘিরে এ বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট বাতিলের আবেদন করেছে বিচার বিভাগ। বিভাগটির দাবি, এসব ভোটারের মধ্যে এমন ব্যক্তিরা থাকতে পারেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এবং ভোট দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে ভোটারদের নথিপত্রও চেয়েছে বিচার বিভাগ। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভোট বন্ধ করার এখতিয়ার বিচার বিভাগের নেই বলেও দাবি করেছে রাজ্যটি।

অন্যদিকে, আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের একই নামের এক প্রার্থী ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কি না, তা নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত জোরদার করেছে বিচার বিভাগ। ড্যান সুলিভান অল্প ব্যবধানে হেরে গেলে নির্বাচনের ফল অনুমোদন স্থগিত রাখার আবেদনও করা হয়েছিল। তবে রবিবার এক ফেডারেল বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন।

দুই রাজ্যেই বিচার বিভাগের করা মামলা আদালতে খারিজ হয়েছে। তবে ভোট গণনা ও ফল অনুমোদনের আগেই নির্বাচনী বিরোধে হস্তক্ষেপের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আলাস্কার মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বিচার বিভাগ।

সমালোচকদের আশঙ্কা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফল নির্ধারণী এ মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সন্দেহ তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টাকে বিচার বিভাগের পদক্ষেপ আরও জোরালো করতে পারে।

বিচার বিভাগের নির্বাচনী কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা সাবেক কর্মকর্তা মার্ক ব্লুমবার্গ বলেন, প্রশাসন বিচার বিভাগকে এমন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে চাইছে, যা আগে নিষিদ্ধ ছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের দাবি, বিচার বিভাগের পদক্ষেপ আইনসম্মত এবং ভোটের স্বচ্ছতা রক্ষার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে। বিভাগের মুখপাত্র কিয়ারস্টেন পেলস বলেন, কোনো নির্বাচনী প্রচারাভিযানে সহায়তা করা হচ্ছে না; বরং আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলো অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। দেশটির আইনে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ব্যাপক জালিয়াতিকে দায়ী করে আসছেন। তবে স্বাধীন গবেষণা ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিরীক্ষায় ভোট জালিয়াতির ঘটনা বিরল বলে উঠে এসেছে।

২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় চ্যালেঞ্জ করে তার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন ৬০টির বেশি মামলা করেছিল। সবগুলোই ব্যর্থ হয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা এসব প্রচেষ্টায় বিভাগটিকে যুক্ত করার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রায়ই আদালতে প্রতিনিধিত্ব করা ইলিয়াস ল গ্রুপের ভোটাধিকারবিষয়ক আইনজীবী লিস ফ্রস্ট বলেন, আগে ডানপন্থী সংগঠনগুলো যেসব মামলা করত, এবার বিচার বিভাগ নিজেই সেসব উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে, নির্বাচনে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল জাতিগত সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল জে. সুলিভানকে বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছিল। এ খবর প্রকাশের পর আলাস্কায় নির্বাচনী বিরোধ আরও তীব্র হয়।

ট্রাম্পের নির্দেশে করা বিচার বিভাগের মামলায় আদালতের কাছে নির্বাচনের ফল অনুমোদন স্থগিত রাখা এবং ভোটারদের বিভ্রান্তির কারণে ফল প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে তদন্তের নির্দেশ চাওয়া হয়েছিল।

তবে অ্যাঙ্কোরেজের ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন রবিবার মামলাটি খারিজ করে বলেন, ভোটের গোপনীয়তা বজায় রেখে আলাস্কার পক্ষে এ ধরনের তদন্ত চালানো সম্ভব নয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটি করার এখতিয়ার বিচার বিভাগের ছিল না এবং এতে রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষ নেওয়ার ধারণা তৈরি হতে পারে।

জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্সির সময় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা পিটার কিসলার বলেন, আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে রাজনৈতিক বিরোধে নিরপেক্ষ থাকা জরুরি। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু পক্ষপাতের ধারণাই তৈরি হয়নি, বাস্তবেও পক্ষ নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।

ব্ল্যাঞ্চের দাবি, ড্যানিয়েল জে. সুলিভানের কথিত জালিয়াতি ঠেকাতেই মামলাটি করা হয়েছিল। তবে ড্যানিয়েল ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পেলটোলার প্রচারশিবিরও বলেছে, সুলিভানদের কোনো প্রচারাভিযানেই তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না।

নির্বাচনী তদন্তে বিচার বিভাগ ঐতিহ্যগতভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়ে থাকে। কারণ, এ ধরনের হস্তক্ষেপ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে কিংবা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নিজেদের স্বার্থে তা ব্যবহার করতে পারে।

বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচনী আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পাবলিক ইন্টেগ্রিটি বিভাগ প্রায়ই তদন্তকারী ও কৌঁসুলিদের নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়ার আগে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ দিত।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ বিভাগের জনবল কমিয়েছে এবং নির্বাচনী দুর্নীতির তদন্তে ফেডারেল কৌঁসুলিদের ওই বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতাও স্থগিত করেছে। বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযোগ গঠনের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণে স্থানীয় ফেডারেল অ্যাটর্নিদের ভূমিকা বেশি কার্যকর।

এ বিষয়ে অবগত তিন ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তকারী ও কৌঁসুলিদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে তা নিষ্পত্তির দায়িত্ব এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে। এমনকি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরও এসব বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনী তদন্তে এ ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ খুব কমই দেখা গেছে। তবে মুখপাত্র পেলসের দাবি, মাঠপর্যায়ে নিষ্পত্তি করা যায় না—এমন বিরোধ মীমাংসা করাই ওই দপ্তরের দায়িত্ব।

সূত্র: রয়টার্স

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত