তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপর্যস্ত বরগুনা, পর্ব-১
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ: ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ, বিয়েও হচ্ছে না কারো কারো
* বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষিত আবর্জনা ফেলা হচ্ছে যত্রতত্র, কয়লা পরিবহনেও মানা হচ্ছে না আইন
* ২১ জন নারীর ওপর জরিপে ১৭ জনের শরীরে মিলেছে চর্মরোগ
* উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ বছরে স্কিন ডিজিজের রোগী বেড়েছে ৩ গুণ
* প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা ৩০% এলার্জি রোগী
* পানি দূষণে পায়রা নদীতে মিলছে না ইলিশ, বায়ু দূষণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত
বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ী ইউনিয়নের সালেহা বেগম। মুখের মতোই তার সারা শরীরেও ছড়িয়ে পড়েছে চর্ম রোগ। দুঃসহ এ যন্ত্রণায় স্বাভাবিক জীবনই যেন থেমে গেছে এই নারীর। তার অভিযোগ, এলাকায় কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরই তার শরীরে অস্বাবিকভাবে বেড়েছে চুলকানি।
সালেহা বেগম বাংলাভিশনকে বলেন, যখন থেকে এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয় তার পর থেকে পানিতে গোসল করলেই শুরু হয় চুলকানি। এখন এমন অবস্থা যে সারা শরীরে এই চুলকানি ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে জ্বালাপোড়ায় আমি কাদি।
তারা বানু নামের আরেক নারী বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর থেকে সারা শরীরে চুলকানি শুরু হয়েছে। চুলকানিতে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া করে। বহু ওষুধ খেয়েছি। আমরা গরিব মানুষ। অত ওষুধ খেতে পারি না, জ্বালাপোড়া শুরু হলে ফ্যানের নিচে গেলে একটু ভালো লাগে কিন্তু আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎও নাই। খুব কষ্ট করছি।

বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ীতে ২০২৩ সালে চালু হয় বরিশাল ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। সেই থেকে ওই এলাকায় ব্যাপক হারে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এ চর্মরোগের কারণে সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে ওই এলাকায় অনেক তরুণীর বিয়েও ভেঙে যাচ্ছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র লাগোয়া বড় অঙ্কুজানপাড়ার ২১ জন নারীর ওপর জরিপ চালিয়ে ১৭ জনের শরীরেই চর্মরোগ পাওয়া গেছে। অন্য ৪ জনেরও ছিলো পরিবেশ দূষণজনিত রোগ।
আসলেই কি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে চর্মরোগ বেড়েছে? বুঝতে বরগুনার তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগী ভর্তির পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা যায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর বছর ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ওই এলাকায় স্কিন ইনফেকশনজনিত রোগী বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি, ডায়রিয়ার রোগী প্রায় আড়াই গুণ, আর অশনাক্ত বিষক্রিয়ার রোগী বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
এ বিষয়ে তালতলী থানা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সব্যসাচী দাস বাংলাভিশনকে বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন যে পরিমান রোগী আউটডোরে সেবা নিতে আসেন তার ৩০% থাকে স্কিন ইনফেকশনজনিত রোগী। এছাড়াও পানি দূষণজনিত বিভিন্ন রোগের রোগী আমাদের এখানে বেশি আসে।
নিশানবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের নারী ইউপি সদস্য ফাতেমা আক্তার বলেন, আমাদের এখানে ঘরে ঘরে এলার্জি। এলার্জিতে মানুষ কষ্ট করছে। এমনও আছে এলার্জিতে চেহারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক মেয়ের বিয়েও হচ্ছে না। এই অবস্থা আগে ছিল না, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পর থেকেই এ অবস্থা হয়েছে। কারণ তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিভিন্ন দূষিত পদার্থ এলাকার যেখানে সেখানে ফেলে দেয়।
ইনফেকশনজনিত রোগ বৃদ্ধির কারণ জানতে বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকার রাস্তার পাশে ছড়িয়ে আছে হলুদ ফোমের মতো পদার্থ। একটু এগোতেই একই বর্জ্যের স্তূপ মেলে পায়রা নদীর তীরেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই নিয়মিত এসব বর্জ্য ফেলা হয় এলাকার ফসলি জমি, খাল ও নদীর পাড়ে। যা শরীরের সংস্পর্শে এলেই শুরু হয় জ্বালাপোড়া। পরে তীব্র চুলকানি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স ফ্যাকাল্ট্রির ডিন ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারকে এই হলুদ পদার্থের ছবি দেখালে তিনি নিশ্চিত করেন এটি গ্লাস উল। যা ব্যবস্থার করা হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ তাপ নিয়ন্ত্রণের কাজে। এটি ভয়াবহ দূষিত উপাদান বলেও নিশ্চিত করেন এই পরিবেশ বিজ্ঞানী।
এই গ্লাস উল রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করে এই পরিবেশবিজ্ঞানী বলেন, এটি কারসিনোজেনিক পদার্থ। এটি মানুষের শরীরের সংস্পর্শে এলে জ্বালাপোড়া করার পাশাপাশি এলার্জি সৃষ্টি করবে। নিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করলে ফুসফুসজনিত নানান রোগ সৃষ্টির পাশাপাশি ক্যান্সারও সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু তাই নয়, পরিবেশ আইন অনুযায়ী কয়লা ঢেকে পরিবহন বাধ্যতামূলক হলেও এখানে আসা লাইটার জাহাজে তা মানতে দেখা যায়নি। এভাবে কয়লার ধুলা নদী ও আশপাশের জনপদে ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাশাপাশি, উৎপাদন শেষে গরম পানি পায়রা নদীতে ছেড়ে দেওয়ারও অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। এই কারণে পায়রা নদীতে আগের মতো ইলিশ পাওয়া যায় না বলে জানান জেলেরা।
এ বিষয়ে শের-ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও জলজ জীববৈচিত্র গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ঠিকমতো ইটিপি না চালিয়ে গরম পানি নদীতে ছেড়ে দেয় এই অভিযোগতো আছেই। সেটা না করলেও যদি ইটিপির মাধ্যমে মিনারেল ওয়াটার ছাড়া হয় সেটাও জলজ জীববৈচিত্রের জন্য ভালা না। কেননা সাধারণত নদীর পানিতে জু-ফ্ল্যাংটন বা ফাইটোপ্ল্যাংটনসহ যেসব খাদ্য উপাদান থাকে মিনারেল ওয়াটারে সেটা থাকে না। নদীতে খাবার না থাকলে এখানে মাছ কেন আসবে। ইলিশ আগের মতো না পাওয়ার কারণ এটাই।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর থেকে এলাকায় নানান রোগ বেড়েছে। এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ মৎস্য শিকার নির্ভর। কিন্তু দূষণের কারণে এখন নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। একারণে বহু জেলে এলাকা ছেঢ়ে পেশা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। আমরা যে এসব দুখের কথা কারো কাছে বলবো এমন কেউও নেই। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হয়তো সারাদেশের উপকার করছে কিন্তু সারাদেশের উপকার করতে গিয়ে আমাদের জীবনকে যে অতিষ্ঠ করে দিয়েছে সেটা দেখার কেউ নেই।
‘সরকারের কাছে সারাদেশের মানুষের জীবনের মূল্য আছে, আমাদেরটাকে কী জীবন মনে করে না সরকার?’ প্রশ্ন তোলেন, পরিবেশকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বাংলাভিশনকে বলেন, তারা কি কমপ্লায়েন্স মানছে না আমি জানি না। আমি কখনো সেখানে যাইওনি। আপনার কাছে কি তথ্য প্রমান আছে আমাকে পাঠান। প্রমাণ পেলে তাদের সতর্ক করবো, তারপর সতর্ক না হলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
যদিও এই বিপর্যয়ের দায় সরকারি সংস্থাগুলোও এড়াতে পারে না দাবি করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, পরিস্থিতি বলছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আর চালু থাকাই উচিত নয়। এখানে যে পরিমান অনিয়ম অবিচার হয়েছে বিষয়টি অবশ্যই চীন সরকারকে জানানো উচিত। একাজটা সরকারকেই করতে হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থা পাওয়ার চায়নাকে একাধিকবার মেইল পাঠানো হলেও কোনো জবাব জবাব দেয়নি চাইনিজ কোম্পানিটি।
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন আগামীকাল
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: