• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপর্যস্ত বরগুনা, পর্ব-২

হাসিনা সরকারের পেশী শক্তির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র: আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভূমি হারানোরা

প্রকাশিত: ১২:৫০, ১ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৪:৫২, ১ আগস্ট ২০২৬

ফন্ট সাইজ

*বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু ২০২৩ সালের শুরুতে, জমি বরাদ্দ পেয়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে!  
* তৎকালীন নেতাদের দিয়ে জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয় সাড়ে ৪শ পরিবারের জমি
*মামলার বোঝা নিয়ে আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভূমি হারানো মানুষ
* আপত্তি উপেক্ষা করে দখল করে নেয় নদী ও খাল
* সমুদ্র সৈকতের বালু তুলে আনায় উপকূলে তীব্র ভাঙনের সৃষ্টি
* প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় নদী রক্ষা কমিশন, আমলে নেয়নি কেউ
*দোষী আমলাদের বিচার চায় টিআইবি


ফাতেমা আক্তার। বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক নারী ইউপি সদস্য। আজ যেখানে বরিশাল ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেখানেই ছিলো তার দোতলা বাড়ি। যা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় দখল করে নেয় বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। এখন পাশের গ্রামে ছোট্ট ঘরে তার বসত। ফাতেমার অভিযোগ, জমি দখলের প্রতিবাদ করার অপরাধে এখনও পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের। 

ফাতেমা আক্তার বলেন, আমাদের জমি যেসময় দখলে নিয়েছিলো তখন আমাদের সব ওয়ারিশকে আগে চাঁদাবাজীর মামলা দেয়। আমরা তখন পুলিশের নির্যাতনে কবরস্থানে গিয়েও থেকেছি।  তারপর পুলিশ দিয়ে এবং প্রভাবশালী নেতাদের দিয়ে আমাদের জমি দখল করে বাড়ি ভেঙে দেয়। সেই থেকে এখনও আমরা হেরেজমেন্টের মধ্যেই আছি।

ফাতেমার মতো বড় অঙ্কুজানপাড়ার জমি হারানো সাড়ে চারশ পরিবারের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুলতান শিকদার। তার দাবি, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পায়রা নদীতে জেগে ওঠা খোট্টারচরের জমি ৯৯ বছরের জন্য ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেয় সরকার। অথচ সেই জমির বড় অংশই দখল করে শুরু হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ।

সুলতান শিকদার বলেন, তারা ৪ পাশের  জমি কিনে বাউন্ডারি তুলে ভেতরে আমাদের সব জমি নিয়ে গেছে। পরে জেলা প্রশাসনও তাদেরকে বেআইনিভাবে জমি বরাদ্দ দিয়েছে। আমাদের জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলা অবস্থায় এটা কী তারা দিতে পারে?

ভুমি হারানো ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০১৭ সালে নির্মাণ শুরু হলেও জেলা প্রশাসন তাদেরকে জমি বরাদ্দই দিয়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। অথচ ততদিনে বিদ্যুৎ উৎপাদনও শুরু হয়ে যায়।

শুধু জনগণের জমিই দখল করা নয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে নদী দখল ও খাল ভরাটের অভিযোগ তুলেছে খোদ জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনই।  জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মুজিবর রহমান হাওলাদার বাংলাভিশনকে বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হয়েছে তিন নদীর একেবারে মোহনায়। এটির জন্য নদীর ফ্লাড প্লেইন এরিয়া দখল করেছে। তিনটি খালও দখল করেছে, বন কেটেছে এমনকি সমুদ্র সৈকত থেকে বালু তুলে এনে জায়গা ভরাট করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পরিবেশগত অনিয়মগুলো জানিয়ে আমরা সরকারের সব সংস্থাকেই চিঠি দিয়েছি। সব মন্ত্রণালয়কেতো জানিয়েছিই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও জানিয়েছি। আমরা বলেছি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতেই হলে এভাবে নদী দখল করে এখানে না করে আরও দূরে করা যেত। এটির কারণে বড় বিপর্যয় হতে পারে। কিন্তু কেউ আমলে নেয়নি কেউই। তারা প্রভাব খাটিয়েই এটি করেছে।

এদিকে খালগুলো ভরাটের কারণে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি এবং কৃষি জমির ব্যবহারযোগ্যতা হারাচ্ছে। শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত থেকে বালু তুলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমি ভরাট করায় উপকূলে ভাঙন প্রকট হয়েছে। কিন্তু জমি দখল থেকে আজ পর্যন্ত এসব সমস্যার বিষয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ধরীত্রি রক্ষায় আমরা’র (ধরা) তালতলী উপজেলা সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত অনিয়ম হয়েছে সেগুলো নিয়ে এলাকাবাসী নানান প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব সমস্যা নিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে কিছু বলার কোনো সুযোগ ছিল। তারা কখনো মানুষের সাথে কথাও বলেনি। চীনারাতো আমাদেরকে পাত্তা দেয়ই না, সরকারের যে সংস্থাগুলো তাদেরকে আইন মানায় বাধ্য করবে তারাও আমাদের কথা শুনার চেষ্টাও করে না।  

চীনা বিনিয়োগে নির্মিত বরিশাল ৩৫০ মেগাওয়ার্ট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে পাওয়ার চায়না। চীনা প্রতিষ্ঠানের এসব অনিয়মের বিষয়ে দেশটির সরকারকে জানানোর পাশাপাশি জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে সরকারকে উদ্যোগি হতে হবে বলে মন্তব্য করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জমি দখল থেকে শুরু করে বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকট সবকিছুই প্রমাণ করছে এখানে সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি হয়েছে। সরকারের উচিত চীন সরকারকে এই চীনা কোম্পানিটির অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানানো। প্রয়োজনে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের আইনী সহায়তাও সরকারের দেওয়া উচিত।

ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে নির্মাণ হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। এটি যে পেশীশক্তি ব্যবহার করে হয়েছে সেটা সবাই জানে।  ক্ষমতার পট পরিবর্তনে নেতারা পালাতে পারে হয়তো পালিয়েছে। কিন্তু এই দুর্নীতি অনিয়মের সঙ্গেতো অনেকগুলো সরকারি আমলাও জড়িত ছিল। তাদের জ্ঞাতসারেই এই অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত আগে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িত আমলাদের বিচারের আওতায় আনা। এখন মানুষের যেসব ক্ষতি হচ্ছে সেটার জরিমানা এদের কাছ থেকেই আদায় করা উচিত। 
 
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপরাধের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে তথ্য প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে সংস্থাটি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে পাওয়ার চায়নাকে একাধিক মেইল করা হলেও দুই মাসেও কোনো জবাব দেয়নি চীনা প্রতিষ্ঠানটি।
 

বিভি/এআই

মন্তব্য করুন: