আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার
সুপার এল নিনোর প্রভাবে ৮ মাসেই মারা যেতে পারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ
শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চরম তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। আর এর ফলে চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জলবায়ু গবেষণা সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব (সিআইএল)। তবে এটি একটি গবেষণাভিত্তিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা নয়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সিআইএলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত চরম তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে। গবেষকেরা বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি করেছেন। এতে স্থানীয় জলবায়ু পরিস্থিতি ও মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কয়েক মাস ধরে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বাড়লে সেটিকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
বর্তমান এল নিনো ইতোমধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বছরের শেষ দিকে আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পূর্বাভাসেও বছরের শেষ নাগাদ শক্তিশালী এল নিনো অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এল নিনোর সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা শুধু তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং খরা, দাবানল ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটোও সতর্ক করেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত গ্যাসের কারণে বাড়তে থাকা বৈশ্বিক তাপমাত্রা এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করতে পারে।
সিআইএলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোই অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। নাইজেরিয়ায় প্রায় ৩১ হাজার ৪০০, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ এবং সুদানে ১৭ হাজার ৬০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের নাইজেরিয়া, সুদান, নাইজার ও চাদে মিলিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ হতে পারে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানও পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে।
গবেষকেরা যে ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর কথা বলেছেন, সেটি একটি পূর্বাভাস- নিশ্চিত সংখ্যা নয়। কিছু বিশেষজ্ঞও এই হিসাবের আঞ্চলিক বণ্টন নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। ফলে বাস্তবে মৃত্যুর সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।
তবে গবেষকদের মতে, এই পূর্বাভাসের উদ্দেশ্য আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়; বরং যেসব এলাকায় তীব্র তাপের ঝুঁকি বেশি, সেখানে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত জনবল প্রস্তুত রাখা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং বাইরে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, এখনই যথাযথ জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে আগামী মাসগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: