• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ২২ মে ২০২৪

Inhouse Drama Promotion
Inhouse Drama Promotion

এনআইডি জালিয়াতরা যেন না থাকে অধরা

মোহাম্মদ অলিদ বিন  সিদ্দিক তালুকদার

প্রকাশিত: ১৬:০০, ১৩ মে ২০২৪

ফন্ট সাইজ
এনআইডি জালিয়াতরা যেন না থাকে অধরা

অনেকেরই এনআইডিতে কোনো না কোনো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করতে যেন ভোগান্তি না হয়, সেজন্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির সেবা কার্যক্রম। সংশোধন, হারানো কার্ড উত্তোলন এবং নতুন কার্ড মুদ্রণে উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের কার কী ক্ষমতা তা নির্ধারণ করা আছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে কাহাতক ভোগান্তি, জানেন কেবল ভুক্তভোগীরা। পদে পদে কতো হয়রানির শিকার হতে হয়, অল্পতে বলে শেষ করার মতো নয়। একের পর কতো ধরনের কাগজপত্রের চাহিদা । 


এ কাজটির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগের। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন অফিসের ইলেকটোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট-ইটিআই ভবনের তথ্যকেন্দ্রের সামনে গেলে তা কিছুটা মালুম করা যায়। সেখানে লম্বা সারিতে হয়রান হওয়া ব্যক্তিদের কারো এনআইডির কোনো তথ্য বা নামের সামান্য অংশ সংশোধন দরকার। কারো হারিয়ে যাওয়ার পর নতুন আইডি তোলা জরুরি। ঠিকানা বদলের প্রার্থীও অনেক। কতো হাইকোর্ট দেখতে হয় তাদের। এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে আরেক খানে দেখিয়ে দেয়া হয়। লাইন মতো বিশেষ চক্রের কাছে গেলে এগুলো কোনো সমস্যাই নয়। তারা নিমিষেই সারিয়ে দিতে পারে। কেবল সংশোধন নয়, লাগলে আস্ত নতুন এনআইডি কার্ডও করে দেয়ার লোকও আছে। মাঝেমধ্যে এ চক্রের কেউ কেউ ধরা পড়ে। ক’দিন এ নিয়ে চলে মাতামাতি-হম্বিতম্বি। পরে ল্যাটা মিটে যায়, কে কোন ফাঁকে বেরিয়ে আবার পুরনো কাজে নামে খবর থাকে না। এরা একদম পেশাদার। কেবল এনআইডির কপি উত্তোলন নয়, এনআইডি সংশোধন, জন্ম নিবন্ধনের ডিজিটাল কপি ও নাম সংশোধন এবং কোভিড-১৯ টিকা, টিন সার্টিফিকেটের কপি সরবরাহে সিদ্ধহস্ত তারা।


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হারানো এনআইডির কপি উত্তোলন, এনআইডি সংশোধনের বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক জোগাড় করা লোকও ধরা পড়েছে ক’দিন আগে। ধরা পড়া লিটন মোল্লা নামের যুবকটি নির্বাচন কমিশনের এনআইডি প্রকল্প কর্মকর্তা জামাল উদ্দিনের সহয়তায় আইডি কার্ড সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে ‘গ্রাহকদের’ চাহিদামতো কাজ করে দিত। এর মাধ্যমে এই মোল্লার আয় প্রায় কোটি টাকা। তার স্বীকারোক্তির পর নির্বাচন কমিশনের এনআইডি প্রকল্পের কর্মকর্তা জামাল উদ্দিনকেও গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সনাশনাল ক্রাইম-সিটিটিসি। সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপি পুলিশ তা জানিয়েছে।


এই গ্রেফতারকৃতরা চুনোপুটি মাত্র। তাদের নিয়েই যতো হৈচৈ করে প্রকারান্তরে এর পেছনের রুই-কাতলাদের পার পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা লক্ষণীয়। সংখ্যায় এরা আসলে দু’চার জন নয়। নির্বাচন কমিশন, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরের কিছু কর্মচারিসহ মিলেমিশে এদের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট আছে। এভাবে নকল বা আসল এনআইডি কার্ড পাওয়ার সুযোগ থাকলে মানুষ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ধর্না দেবেই বা কেন? এনআইডি কার্ড হারিয়ে গেলে কিংবা তথ্য পরিবর্তন করতে হলে নির্বাচন কমিশনে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এ প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ভোগান্তি অবধারিত। মানুষের এই ভোগান্তি জালিয়াত চক্রের জন্য পুঁজি। সাধারণ মানুষের বাইরে কোনো দাগী অপরাধী, জালিয়াত চক্র বা অসৎ উদ্দেশ্যেও এনআইডি কার্ডে নাম পরিবর্তনসহ ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তনের জন্যও ভুয়া এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে। অনেকের বাড়ি, জমিজমা এবং সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়। এছাড়া, নাম পরিবর্তন করে অর্থপাচারকারিরাও অর্থপাচার করে পার পেয়ে যায়। এমনকি ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে ব্যাংক থেকে অন্যের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। মাঝেমধ্যেই ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে অনেক রোহিঙ্গার বিদেশ পাড়ি জমানোর নজির তো আছেই।

গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনআইডি কার্ড বাধ্যতামূলক। এনআইডি নামের কাগজটি এখন আর কেবল ভোটের বিষয় নয়। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য এবং বিভিন্ন ধরণের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার জন্য এটি জরুরি। সরকারি সব অনলাইন সুবিধা, ড্রাইভিং লাইসেন্স করা ও নবায়ন, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, সম্পত্তি কেনাবেচা, আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন প্রাপ্তি, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ই-পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণগ্রহণ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, সহায়তা প্রাপ্তি, টিআইএন, শেয়ার-বিও একাউন্ট, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বীমা স্কিম, ই-গভর্নেন্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল সংযোগ, হেলথ কার্ড, ই ক্যাশ, ব্যাংক লেনদেন ও শিক্ষার্থীদের ভর্তিসহ বহু কাজে এনআইডি লাগছে। এতোসব আবশ্যকতার কারণে নকল এনআইডি তৈরি বড় রকমের ঝুঁকি। এ চক্রের হোতাদের ধরতে পুলিশের সাথে নির্বাচন কমিশনও অভিযানে নেমেছে কখনো কখনো। ফলাফল তেমন আসেনি। রাজধানীর বাইরে দেশের বড় বড় শহরগুলোতেও এসব চক্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সমাজের অনেক সম্মানিত ব্যক্তি বা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও প্রতারণায় শিকার হতে পারেন। হয়েছেন-হচ্ছেনও। সামনে আরো হওয়ার শঙ্কা ভর করেছে। দেশের লাখ লাখ নাগরিকের নাম, ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর, জন্মনিবন্ধন,জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পেশা ইত্যাদির তথ্যাদি চুরি হয়েছে সরকারি সংস্থার কার্যালয় থেকে।  


কারো ব্যক্তিগত ভাণ্ডার থেকে নয়, সরকারি ওয়েবসাইট থেকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস যেনতেন ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে ফেঁসে যাওয়ার অবশিষ্ট আর কিছু থাকে না। বাংলাদেশের এ মারাত্মক খবরটিও জানা হয়েছে বিদেশি মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ দিয়েছে বাংলাদেশে একটি সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের তথ্য ফাঁসের খবরটি। দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বিটক্র্যাক সাইবার সিকিউরিটির গবেষক ভিক্টর মারকোপাওলোস গত ২৭ জুন হঠাৎ ফাঁস হওয়া তথ্যগুলো দেখতে পান। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি তা জানান বাংলাদেশ সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম-বিজিডি ই-গভ সার্টকে। খবরটির সত্যতা যাচাই করেছে তথ্যপ্রযুক্তির খবর দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ। বিগত বা বর্তমানের কিছু নেই। যা ফাঁস হয়ে গেছে তার কী হবে? সামনে যে আরো কিছু ঘটবে না, সেই গ্যারান্টিও নেই। তারওপর এখন আপদের ওপর বিপদের মতো এএনআইডির হাট-বাজারের খবর চরম উদ্বেগের। 

লেখক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলাপোস্ট 

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত
Drama Branding Details R2
Drama Branding Details R2