• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ | ১৬ আষাঢ় ১৪২৯

চা নিয়ে চাচাচা

ডা. তাজরীন আলম মিথিলা

প্রকাশিত: ২২:০১, ২১ মে ২০২২

আপডেট: ২২:১০, ২১ মে ২০২২

ফন্ট সাইজ
চা নিয়ে চাচাচা

ডা. তাজরীন আলম মিথিলা

সকালে এক কাপ চা না খেলে আমাদের অনেকের দিনই শুরু হয় না। চা সাধারণত সুগন্ধযুক্ত, প্রশান্তিদায়ক ও স্বাদবিশিষ্ট এক ধরনের উষ্ণ পানীয়, যা অনেকেই উপভোগ করে। ক্লান্ত দেহে যখন অলসতা এসে বাসা বাঁধে তখনই এই আলস্য দূর করতে চাই এক কাপ চা। ইংরেজিতে চা-এর প্রতিশব্দ হলো টি(Tea)। গ্রিকদেবী থিয়ার  নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। চীনে ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরে হয় যায় ‘চা’।

বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ   মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তিনি ৪ জুন  ১৯৫৭ সাল হতে ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বাঙালি হিসাবে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থেকে বাঙালি জাতিকে সম্মানিত করেন। 

বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন চা চাষাবাদ, চায়ের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে এদেশে চা শিল্পের ব্যাপক উন্নতি সাধন হয়। আজকে িআন্তর্জাতিক চা দিবস উপলক্ষে চলুন জেনে নেই চায়ের গুনাগুন ও ক্ষতিকর  দিকগুলো। 

পুষ্টিগুণাগুণ: স্বাস্থ্য রক্ষায় চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিগুণ সামান্য হলেও এতে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেমন- পলিফেনলস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং ক্যাটেচিন। পলিফেনলস এবং ক্যাটেচিন ফ্রি রেডিক্যালস তৈরিতে বাধা দেয় এবং কোষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। একারণে চা ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চায়ে উপস্থিত পলিফেনলসের পরিমাণ ২৫% এরও বেশি যা দেহের অভ্যন্তরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

চায়ে ৭% থিওফাইলিন ও থিওব্রোমিন রয়েছে যা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির জন্য অনেক উপকারী। চা এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হলেও এতে রয়েছে ক্যাফেইন নামক উত্তেজক পদার্থ।    সাধারণত এক কাপ চায়ে রয়েছে (৩০-৪০) মিলিগ্রাম ক্যাফেইন এবং এক কাপ কফিতে এর প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ (৮৫ মিলিগ্রাম) ক্যাফেইন রয়েছে। বস্তুত ক্যাফেইনের কারনেই ঘুম কম হওয়া,হজমে ব্যঘাত ঘটা ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই ক্যাফেইনের কিছু ভালো দিকও রয়েছে। এটি হৃদপিন্ড ও দেহের অন্যান্য পেশি সতেজ রাখতে সহায়তা করে।

চায়ের উপকারিতা: যেহেতু চা আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী, সেহেতু এই চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু উপকারী এবং কতটুকু ক্ষতি করছে তা জানা অত্যাবশ্যক। আজ আসুন জেনে নিই বিভিন্ন রকম চা পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা সম্পর্কে।

? সবুজ চা বা গ্রিন টি: ফিগার ঠিক রাখতে অনেকেই গ্রীন টি-এর প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। গ্রীন টি প্রথমে ছিল ওষুধ, তারপর পানীয়তে পরিণত হয়েছে। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে দুই কাপের বেশি গ্রিন টি পান করেন তারা  মানসিকভাবে অনেক বেশি ফিট। সবুজ চায়ে রয়েছে   ভিটামিন এ, সি, ই, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও বিভিন্ন খনিজ উপাদান যা প্রতিটি মানুষের শরীরেই প্রয়োজন। নিয়মিত সবুজ চা পান করলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমিয়ে দেয়। এছাড়াও কিডনি রোগের জন্য উপকারী। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। পোকামাকড় কামড়ালে যদি ঐ স্থান চুলকায় ও ফুলে যায় তাহলে সবুজ চায়ের পাতা দিয়ে ঢেকে দিলে আরাম বোধ হয়। রক্তে কোলেস্টোরেলের মাত্রা কমায়। ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী।

? আদা চা: আদা চা খুবই উপকারী। বিশেষ করে    সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে এটি ওষুধের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। গরম আদা চা পান করলে গলাব্যথা কমে যায়। এসিডিটির বিরুদ্ধেও আদা চা কাজ করে। আদা চা পান করলে হজমের সমস্যা কমে।

? দুধ চা: ক্লান্তি দূরীকরণে খুবই কার্যকর। নিয়মিত চা ও কফি পানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। চা বা কফি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫ গুণ কমিয়ে দেয়। এছাড়া এ সময় স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ানো বলে এক গবেষণায় দেখা গেছে।

? লাল চা: এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ফ্লু, ঠান্ডা, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রমণ ও অন্ত্রের প্রদাহ থেকে প্রতিরোধ করে দেহকে সুরক্ষা রাখে। লাল চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। হজম ভালো করে। এর মধ্যে থাকা ট্যানিন হজম প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের সমস্যা এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে। লাল চা অন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধেও কাজ করে।
গবেষণায় বলা হয়, লাল চা খাওয়া কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের জারিত হওয়া প্রতিরোধে কাজ করে। নিয়মিত লাল চা খেলে হৃৎপিন্ড ভালো রাখে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান দাঁতের ক্ষয় তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া এর মধ্যে থাকা ফ্লোরাইড মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।

লাল চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রেক্টাল, জরায়ুর ক্যানসার, ফুসফুস ও ব্লাডার ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এটি স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার ও পাকস্থলীর ক্যানসারও প্রতিরোধে কাজ করে।

অতিরিক্ত চা খাওয়ার ক্ষতিকর দিক: 
⚠️ চায়ের ক্যাফেইন ঘুমের চক্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত চা পান ঘুমের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

⚠️ চায়ের মধ্যে থাকা থিওফাইলিন নামে একটি রাসায়নিক উপাদান শরীরে ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে যেটা হজমে সমস্যা তৈরি করে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।

⚠️ ঘুমে সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে উদ্বেগ ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

⚠️ গর্ভবতী নারীদের চা পান  এড়িয়ে চলা উচিত।  চা-তে উপস্থিত ক্যাফেইন ভ্রুণের বিকাশে বাধা প্রধান করতে পারে। 

⚠️ চায়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো অতিরিক্ত চা পান প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা চা পান করে না এবং যারা প্রচুর চা পান করে তাদের মধ্যে অতিরিক্ত চা পানকারীদের প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
⚠️ হৃৎপিন্ডের জন্য অতিরিক্ত ক্যাফেইন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যাদের হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে বা যারা হৃদরোগ থেকে আরোগ্য লাভ করছেন তাদেরকে চা এড়িয়ে চলা উচিত।

চা সম্পর্কে ভুল ধারণা: চা সম্পর্কে আমাদের অনেকের ভুল ধারণা আছে। যেমন চা খেলে রাতে ঘুম আসে না, চা লিভারের ক্ষতি করে, চা চামড়া কালো করে এসব ধারণাগুলো ভুল।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: