• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাসের ধাক্কায় জালালের মৃত্যু, অনিশ্চয়তায় স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
বাসের ধাক্কায় জালালের মৃত্যু, অনিশ্চয়তায় স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ

রাজধানীর উত্তরার তুরাগ থানাধীন ধউর এলাকার কালু মিয়া বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিনের মতোই বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন মীর জালাল আহমেদ (৫০)। কিন্তু সেদিন আর ঘরে ফেরা হয়নি তার। ঢাকা-সিলেটগামী এনা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

জালালের আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, অনিশ্চয়তায় পড়েছে একটি পুরো পরিবার। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে তাঁদের পড়াশোনা শেষ করবেন—জানেন না স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম (৪২)।

পরিবারের সদস্যরা জানান, জালাল ছিলেন শান্ত, নিরীহ ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। গার্মেন্টসে ছোট একটি চাকরি করে অতি কষ্টে সংসার চালাতেন। ধউরের ভাড়া বাসায় স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছেন তিনি।

একটি দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন পরিবার
পরিবারের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় ধউরের কালু মিয়া বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন জালাল। এ সময় ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-০৩১০ নম্বরের এনা পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে এসে তাঁকে ধাক্কা দেয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।

গুরুতর আহত জালালকে ইস্ট ওয়েস্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ধউর এলাকায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনার পর বাসটি তুরাগ থানায় রয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত এনা পরিবহনের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাঁদের।

ছেলের বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নও থমকে গেল
জালালের বড় ছেলে আনিসুর রহমানের বয়স ২৬ বছর। অনার্স শেষবর্ষের এই শিক্ষার্থী IELTS পরীক্ষায় ৭.৫ স্কোর করেছিলেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে একটি এজেন্সির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় যান তিনি।

পরিবারের দাবি, আনিসুরকে ফুল স্কলারশিপ দেওয়ার কথা বলা হলেও দেশটিতে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তিনি জানতে পারেন, কথিত ওই স্কলারশিপের মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস। এরপর প্রায় দুই বছর নিজের খরচে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় তাঁকে।

ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বাবা জালাল ঋণ করে অর্থ পাঠিয়েছেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটের কাছে হার মেনে গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন আনিসুর। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন।

পরিবারের দাবি, ছেলের বিদেশে পড়াশোনার খরচসহ বিভিন্ন কারণে এরই মধ্যে তাঁদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে।

মেয়ের পড়াশোনাও অনিশ্চয়তায়
জালালের মেয়ে তাবাস্সুম আক্তার জিনিয়ার বয়স ১৭ বছর। সে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ভাইয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে যে পরিবারটি এরই মধ্যে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা বহন করছে, বাবার মৃত্যুর পর জিনিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জালালের স্ত্রী নুরুন্নাহার একজন গৃহিণী। স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারে এখন নিয়মিত আয়ের কোনো নিশ্চিত উৎস নেই। ফলে সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং দুই সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

‘জালাল ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ’
জালালের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এমন স্বজনরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, নিরীহ ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। কারও সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর মতো মানুষ ছিলেন না তিনি।

তাঁদের সঙ্গে জালালের পরিবারের দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। জালালের মেয়ে জিনিয়াও ছোটবেলা থেকেই ওই পরিবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠকে ‘বাবা’ বলে ডাকত। ফলে জালালের আকস্মিক মৃত্যু শুধু তাঁর নিজের পরিবারেই নয়, দীর্ঘদিনের পরিচিতজনদের মধ্যেও গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

সরকারের কাছে পরিবারের আকুতি
পরিবারটির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহায়তা চেয়েছেন স্বজনরা। তাঁদের দাবি, দুর্ঘটনাটি যথাযথভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী পরিবারটির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক।

একই সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু এবং দুই সন্তানের শিক্ষাজীবনের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

স্বজনদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু হয়তো পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জালাল আহমেদের পরিবারের কাছে এটি শুধু একজন স্বজনকে হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার গল্প।

একজন স্ত্রী হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকে, দুই সন্তান হারিয়েছে তাদের বাবাকে। একই সঙ্গে পরিবারটি হারিয়েছে তাদের একমাত্র নির্ভরতার জায়গা।

এখন জালালহীন পরিবারটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সংসারের এই কঠিন সময়ে তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ কীভাবে এগিয়ে যাবে?

স্বজনদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে এবং ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করবে।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: