উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে রংপুরের ১৩ দফা দাবি
দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করে রংপুর বিভাগকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলধারায় এগিয়ে নিতে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও বিমান যোগাযোগ আধুনিকায়ন, গ্যাস সরবরাহ চালু, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নসহ এসব দাবিকে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগরীর শাপলা চত্বর এলাকার জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। ফোরামের সভাপতি ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সমান বরাদ্দ দিলেই এ অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে না। পিছিয়ে থাকা এলাকার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ বরাদ্দ ও পৃথক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
রংপুর বিভাগের উন্নয়ন দাবির কেন্দ্রে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা রয়েছে তিস্তা অববাহিকার মানুষের মধ্যে। ফোরামের পক্ষ থেকে নদীভাঙন, কৃষি, জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নদীটির সম্পর্ক সরাসরি। নদীভাঙন ও পানির ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছর এ অঞ্চলের মানুষকে নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। তাই শুধু প্রকল্পের ঘোষণা নয়, এর বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
উত্তরাঞ্চলের শিল্প ও অর্থনীতিতে গতি আনতে দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির দ্বিতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। ফোরামের মতে, স্থানীয়ভাবে কঠিন শিলার উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ১৩ দফায়। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ, রংপুর বিভাগের সড়ক, সেতু ও কালভার্টের বিশেষ উন্নয়ন এবং বিভাগজুড়ে রেল যোগাযোগ আধুনিকায়নের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুতগতির ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে রেলপথকে সময়োপযোগী করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে কার্যকর উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা গেলে এ খাতেও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রংপুর বিভাগে গ্যাস সরবরাহ চালুর দাবিও রয়েছে ১৩ দফায়। পাশাপাশি কৃষিকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবিও জানানো হয়েছে।
শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন চায় ফোরাম। রংপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রংপুর মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বিভাগের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আধুনিকায়নের কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বিভাগের জেলা শহরগুলোকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। ফোরামের মতে, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ছাড়া শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন। তাই যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নকে সামগ্রিক আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েও বক্তব্য দেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য সমান আচরণ নিশ্চিত করা দরকার। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগের উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক দাবি নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার। এ কারণে ১৩ দফা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, রংপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করা হলে তারা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবেন। সরকারের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য, রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ এটিএম আজম খান, জেলা ও মহানগর জামায়াতের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে উল্লেখ না করে সংগঠনের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় করানো হচ্ছে। তিনি ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং সংগঠনের প্রাথমিক সহযোগী সদস্যের ফরম পূরণ করেন। ফলে তাকে বর্তমানে সংগঠনের সহযোগী সদস্য/কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিভি/এআই













মন্তব্য করুন: