বাবার দিনমজুরি, এনজিওর কিস্তি: অভাবকে হারিয়ে কাজল আজ বিচারকের আসনে
পেটে ক্ষুধা, বাবার মাথায় এনজিওর কিস্তির বোঝা আর দিনমজুরির সামান্য আয়—এমন বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাজল পাঁড়ে। খাবার না থাকায় অনেক দিন না খেয়েই স্কুলে যেতে হয়েছে তাকে। তবে দারিদ্র্যের কাছে হার মানেননি। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস—বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন ‘তুরি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই তরুণ। শুধু নিজের নয়, সরকারি চাকরিজীবীহীন মাধাইপুর গ্রামের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রাম। ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে কাজল। অভাবের কারণে তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। আর কাজলের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বাবা-মাকে করতে হয়েছে কঠিন সংগ্রাম।
মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয় কাজলের শিক্ষাজীবন। এরপর মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। একসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।
ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, গরু বিক্রি, এমনকি কাজের বিনিময়ে টাকা কর্মসূচিতে শ্রমিকের কাজও করেছেন বাবা। আর নিজের খরচ চালাতে ক্যাম্পাসে টিউশনি করেছেন কাজল। কিন্তু অভাব কখনো তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি।
অবশেষে দীর্ঘ কষ্টের পথ পেরিয়ে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন কাজল। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দে ভাসছে পুরো মাধাইপুর গ্রাম। ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নিয়েছেন এলাকাবাসী।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা। তার চোখে আনন্দের জল। পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীর ভাষ্য—কাজলের মেধা, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
কাজলের এই সাফল্যে গর্বিত তার শিক্ষকরাও। তাদের প্রত্যাশা, বিচারকের দায়িত্বে থেকেও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন তিনি। আর তার এই অর্জন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।
অভাবের কুঁড়েঘর থেকে বিচারকের আসনে—কাজল পাঁড়ের এই পথচলা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি মাধাইপুর গ্রামের প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার ইতিহাসও। তার অর্জন দেখিয়ে দিয়েছে, দারিদ্র্য স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানে।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: