দুই হাতের আঙুল নেই, পা দিয়ে লিখেই জিপিএ-৩.৫
দুই হাতের আঙুল নেই, তবু থেমে থাকেনি স্বপ্নের পথে চলা। শৈশবেই হারিয়েছেন বাবাকে, জীবনের শুরু থেকেই মোকাবিলা করছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু কোনো বাধাই দমাতে পারেনি অদম্য মেধাবী কলি রানীকে। দুই হাতের পরিবর্তে ডান পা দিয়ে লিখেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫ অর্জন করেছেন তিনি। অসাধারণ এই সাফল্যে গর্বিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে কলি রানী। কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেন। তার এই ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট কলি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবাকে হারান তিনি। এরপর মা রূপালী রানীর স্নেহ, ভালোবাসা ও সাহসই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। দুই হাতে লিখতে না পারলেও ডান পা দিয়েই শুরু করেন লেখাপড়ার সংগ্রাম। ধীরে ধীরে সেই পায়ের লেখাই হয়ে ওঠে সাফল্যের হাতিয়ার।
মা রূপালী রানী বলেন, জন্মগত প্রতিবন্ধকতা থাকলেও কলি কখনো মনোবল হারায়নি। নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। পরিবারের সহযোগিতার পাশাপাশি সহপাঠীদের আন্তরিকতা ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। মেয়ের এই সাফল্যে তিনি ভীষণ আনন্দিত।
শুধু পড়াশোনায় নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কলি। ডান পা দিয়েই অনায়াসে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন তিনি। পাশাপাশি গানের প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ ও দক্ষতা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে পেয়েছেন পুরস্কার ও প্রশংসা। প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রতিনিয়ত নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি।
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি সবার সঙ্গে বসে পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করে সে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
গদাই গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, কলি শুধু পড়াশোনায় ভালো নয়, তার মধ্যে অনেক প্রতিভা রয়েছে। পা দিয়ে লিখে এমন সাফল্য অর্জন সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই অর্জনে পুরো এলাকাবাসী আনন্দিত ও গর্বিত।
কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, দুই হাতের আঙুল না থাকা সত্ত্বেও পা দিয়ে লিখে কলি জিপিএ-৩.৫ পেয়েছে। তার এই ফলাফলে তারা অত্যন্ত খুশি। মেধাবী এই শিক্ষার্থী যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে জীবনে আরও এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এর আগেও পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে কলি। একের পর এক সাফল্য তাকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এবার তার লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে কলি রানী বলে, “উচ্চশিক্ষা শেষ করে একজন বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে চাই। আমি প্রমাণ করতে চাই, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না।”
কলির স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার সুযোগ, আর্থিক সহায়তা ও সবার আন্তরিক সহযোগিতা। স্বপ্নের ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চায় সে। এ জন্য কলি ও তার পরিবার সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের কাছে আর্থিক সহযোগিতা এবং সবার আশীর্বাদ কামনা করেছেন।
দুই হাতের আঙুল নেই, কিন্তু স্বপ্ন ছোঁয়ার অদম্য শক্তি আছে। বাবাকে হারানোর শোক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে পায়ের লেখনীতে যে মেয়েটি সাফল্যের গল্প লিখছে, সেই কলি রানী আজ শুধু নিজের পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। সবার প্রত্যাশা, তার এই পথচলা যেন থেমে না যায়।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: