ফ্রেমে বন্দী সময়, ছবিতে বেঁচে থাকা গল্প
একটি মুহূর্ত চলে যায়, কিন্তু একটি ছবি তাকে থামিয়ে রাখতে পারে। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখ, কোনো বিকেল, কোনো সামাজিক পরিবর্তন কিংবা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সবকিছুকে ফ্রেমের ভেতর ধরে রেখে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য শিল্পের নাম আলোকচিত্র। প্রতি বছর বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ছবি তোলা কেবল ক্যামেরার শাটার চাপার বিষয় নয়; এটি সময়, মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজকে দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। একটি ছবি কখনো নীরব থেকেও কথা বলে, কখনো একটি সময়ের সাক্ষ্য হয়ে ওঠে, আবার কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ছড়িয়ে দেয় বৃহত্তর সমাজের কাছে। গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত চার আলোকচিত্রীর অভিজ্ঞতা, ভাবনা ও প্রত্যাশায় উঠে এসেছে সেই আলোকচিত্রেরই বহুমাত্রিক গল্প তুলে ধরেছেন, মো. রাজিউল ইসলাম শান্ত
ছবি—অনুভূতি প্রকাশের এক নীরব ভাষা
আলোকচিত্র কেবল দৃশ্য ধারণের মাধ্যম নয়, অনুভূতি প্রকাশের একটি ভাষা। তাঁর আলোকচিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল মোবাইল ক্যামেরার মাধ্যমে, নিছক আগ্রহ ও ভালো লাগা থেকে। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয় এবং গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন নানা অভিজ্ঞতা। তাঁর মতে, একজন দক্ষ আলোকচিত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। ক্যামেরা দিয়ে সবাই ছবি তুলতে পারে, কিন্তু একটি মুহূর্তের অনুভূতি ও গল্পকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হলে সেই মুহূর্তকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হয়। আলোকচিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি আশাবাদী। প্রযুক্তির অগ্রগতি, মোবাইল ফটোগ্রাফি ও ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্তারে এ ক্ষেত্রের সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বকীয়তা ও কাজের মান ধরে রাখা জরুরি। তাঁর বিশ্বাস, যার মধ্যে আলোকচিত্রের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, শেখার আগ্রহ এবং নিজস্ব দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখার সক্ষমতা রয়েছে, সে নিজের পথ খুঁজে নিতে পারবে। কারণ আলোকচিত্র একটি মুহূর্ত, অনুভূতি ও গল্পকে চিরস্থায়ী করে রাখার মাধ্যম।
ইসরাত জাহান ইভা
সাবেক অর্থ সম্পাদক, গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি
শখ থেকে পেশাদারিত্ব—ফ্রেমে ফ্রেমে এক দীর্ঘ যাত্রা
২০১৬ সালে শখ থেকে শুরু করে ২০২০ সালে পেশাদার ও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হওয়া—এই দীর্ঘ যাত্রা তাঁর অভিজ্ঞতায় এনে দিয়েছে এক গভীরতা। তাঁর কাছে মুহূর্তকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখা মানে কেবল শাটারের ক্লিক নয়; বরং একটি সময়কে ফ্রেমবন্দী করে অমর করে রাখা। ২০১৬ সালের সেই শখের শুরু থেকে ২০২৪ সালের সাংগঠনিক পথচলা প্রতিটি ছবি তাঁর কাছে শেখার এবং সময়কে ধরে রাখার একেকটি সাক্ষী। তাঁর বিশ্বাস, একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। ফটোগ্রাফি নিজের ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাজ, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প ফুটিয়ে তোলার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। একজন আলোকচিত্রীর জন্য ক্যামেরা বা লেন্সের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিখুঁত ফ্রেম কিংবা সঠিক আলোর জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মানসিকতা। সাধারণের ভেতর অসাধারণকে খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ছবির পেছনের গল্পটিও সততার সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। তাঁর ভাষায়, ক্যামেরা শুধু প্রযুক্তি; আসল ছবি তৈরি হয় আলোকচিত্রীর চোখের পেছনে থাকা ভাবনা থেকে। বর্তমান AI ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আলোকচিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এর সম্ভাবনা এখনো ব্যাপক ও পরিবর্তনশীল। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই খাতের উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আলোকচিত্রের ব্যাপক কাজ রয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কাজ বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিবর্তে চাকরির মাধ্যমে আলোকচিত্রী নিয়োগের ব্যবস্থা করা গেলে এ খাতের চিত্রই বদলে যেতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলোকচিত্র বিষয়ে পৃথক বিষয় বা বিভাগ চালুর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের অনুভূতি থেকে তোলা একটি ছবির আবেগ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই মৌলিক কনটেন্ট ও প্রামাণ্যচিত্রের চাহিদা সবসময়ই থাকবে।
রেহান ইসলাম রুমন
সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (জিবিপিএস)
আলোকচিত্রে সময় ও ইতিহাসকে ধারণের গল্প
আলোকচিত্র শুধু একটি ছবি নয়, সময়কে ধরে রাখার এক শক্তিশালী মাধ্যম। কয়েক সেকেন্ডের একটি মুহূর্তের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে গল্প, অনুভূতি, সময় কিংবা ইতিহাস। তাই তাঁর কাছে ফটোগ্রাফি শুধু সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দী করা নয়; বরং সমাজ ও সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। “আলোকচিত্র সংরক্ষণে বিশ্ব ইতিহাস রক্ষা করি”—এই ভাবনাটিই তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, স্থাপনা কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনা—সবকিছুই আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তাঁর নিজের যাত্রাও শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক ভালো লাগা থেকে। আকাশ, মেঘ, আলো, সূর্যাস্ত কিংবা রঙের পরিবর্তন তাঁকে আকৃষ্ট করত। তখন কম্পোজিশন, আলো কিংবা গল্প তৈরির কৌশল জানা ছিল না; ভালো লাগত বলেই ছবি তুলতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁর ফটোগ্রাফির আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, একটি ছবি শুধু চোখ দিয়ে দেখলেই হয় না—তার পেছনের গল্পও দেখতে হয়। একটি ছবিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, একটি ছবি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। একটি অ্যাওয়ার্ড এবং শ্রদ্ধেয় ড. জাফরউল্লাহ স্যারের হাত থেকে সেই পুরস্কার গ্রহণ তাঁর আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। এরপর সাধারণ সদস্য থেকে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠনের সঙ্গে তাঁর পথচলা এগিয়েছে। তাঁর কাছে ফটোগ্রাফি এখন শখের সীমা পেরিয়ে শেখা কাজ করা, মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এবং চারপাশের গল্প তুলে ধরার মাধ্যম। একজন আলোকচিত্রীর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কাছে ধৈর্য ও অধ্যবসায়। কাঙিক্ষত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা, পর্যবেক্ষণ, সৃজনশীলতা, সংবেদনশীলতা এবং নিয়মিত চর্চাই একজন আলোকচিত্রীকে আলাদা করে। বর্তমান বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। সাংবাদিকতা, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন, ডকুমেন্টারি, পর্যটন, গবেষণা ও সৃজনশীল পেশায় এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে ছবির ঐতিহাসিক ও সামাজিক মূল্য সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি। তাঁর কাছে ফটোগ্রাফি এখন আর শুধু ছবি তোলা নয়; এটি তাঁর দেখার দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। একটি ভালো ছবি মুহূর্তকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু সেই মুহূর্তের গল্পকে বাঁচিয়ে রাখে বহু বছর।
আরমান হাসান,
সাধারণ সম্পাদক, গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি
সময়কে থামিয়ে রাখার অদ্ভূত উদযাপন
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস কেবল একটি তারিখ নয়; এটি সময়কে থমকে দেওয়ার এক অনন্য উদযাপন। তাঁর মতে, একটি ভালো ছবি শত শত শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে-যা অতীতকে জীবন্ত রাখে এবং জীবনের অমূল্য মুহূর্তকে চিরন্তন করে তোলে। গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই তাঁর আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে পথচলার ভিত্তি তৈরি হয়। ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে বন্ধুদের সঙ্গে ফ্রেম খোঁজা, সংগঠনের সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখা এবং ক্যামেরার লেন্সের পেছনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার মধ্য দিয়েই তাঁর যাত্রা। তাঁর কাছে একজন আলোকচিত্রীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। দামি ক্যামেরা কিংবা প্রযুক্তি কেবল মাধ্যম; আসল ছবি তোলা হয় চোখের দৃষ্টিভঙ্গি ও হৃদয় দিয়ে। ফ্রেমের ভেতরের আবেগ এবং পেছনের অদৃশ্য গল্প অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন গভীর দৃষ্টি ও সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষার ধৈর্য। আলোকচিত্রের ভবিষ্যৎকে তিনি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও বৈচিত্র্যময় মনে করেন। প্রযুক্তি বদলাবে, কাজের ধরন বদলাবে, কিন্তু একজন আলোকচিত্রীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মৌলিকতা ও আবেগের জায়গা অন্য কিছু সহজে দখল করতে পারবে না। যারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে সত্যিকারের গল্প ফুটিয়ে তুলতে পারবেন, তাঁদের কদর সবসময় থাকবে।
আলোকচিত্রের এই চারটি অভিজ্ঞতা আসলে চারটি আলাদা পথের গল্প হলেও তাদের গন্তব্য যেন একই সময়কে ধারণ করা, গল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং মানুষের অনুভূতিকে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রযুক্তি বদলাবে, ক্যামেরা আরও আধুনিক হবে, AI আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে; কিন্তু একজন মানুষের চোখে দেখা পৃথিবী, হৃদয়ে অনুভব করা মুহূর্ত এবং সত্যকে ধারণ করার মানবিক দায়বোধের বিকল্প তৈরি করা কঠিন। বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে তাই ছবির দিকে তাকানোর পাশাপাশি ছবির পেছনের মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গিকেও মনে রাখা জরুরি। কারণ একটি ছবি শুধু একটি ফ্রেম নয় কখনো তা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল, কখনো স্মৃতির আশ্রয়, আবার কখনো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
আলিসা বিশ্বাস শ্রাবণী,
সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য, গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: