• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা অপরাধী হলে বিচার হবে না কেন?

শহিদুল ইসলাম কবির

প্রকাশিত: ১৩:০৪, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা অপরাধী হলে বিচার হবে না কেন?

স্পিকারের কঠোর মন্তব্যের পর রাষ্ট্রের কাছে আরও বড় প্রশ্ন- দুর্নীতির বিচার কি হবে দল-মত-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে? ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন। স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এমপি। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয়ে বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে কঠোর মন্তব্য করেন- ‘আমাদের অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুষখোরি, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।’

একজন জাতীয় সংসদের স্পিকার যখন এমন মন্তব্য করেন, তখন বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারি সেবা এবং দুর্নীতির বাস্তবতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিতর্কের দরজা খুলে যায়।

কিন্তু, এখানেই শেষ নয়। বরং স্পিকারের বক্তব্যের পর জনগণের পক্ষ থেকে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসা জরুরি- 
দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা যদি অপরাধী হন, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকা দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহি করবে কে?

সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ নিলে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করলে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু, একইভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, এমপি, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার বা অর্থপাচারের অভিযোগ উঠলে তাকেও একই আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

কারণ, দুর্নীতির কোনো দলীয় পরিচয় নেই।

একজন কর্মকর্তা অফিসে বসে ঘুষ নিলে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষতি করেন। কিন্তু, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে যদি বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের অভিযোগ ওঠে, সেটিও একইভাবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ। বরং এর প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে।

তাই, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে একেবারে পরিষ্কার-
কে ক্ষমতায়, কে বিরোধী দলে, কে সরকারি কর্মকর্তা, কে ব্যবসায়ী- তা নয়; অপরাধের প্রমাণ আছে কি না, সেটিই হবে বিচারের মূল প্রশ্ন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্যও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ দেখায়। তাদের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপ অনুযায়ী, ৮১.৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে এবং ওই সময়ে ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর অর্থ হলো- দুর্নীতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি আঘাত করছে। একটি সনদ, একটি অনুমোদন, একটি সরকারি সেবা কিংবা একটি বৈধ অধিকার পেতে যদি নাগরিককে ঘুষ দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার জন্য?

তবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু ‘ঘুষখোর কর্মকর্তা ধরার অভিযান’-এ সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না।

দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা ও প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর কোনো অংশ যদি পরস্পরের সহযোগিতায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেই পুরো কাঠামোকে চিহ্নিত করতে হবে। এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।

ক্ষমতায় থাকলে নিজের দলের দুর্নীতি আড়াল করা এবং বিরোধী দলে থাকলে অন্য দলের দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হওয়া- এটি দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতি নয়; এটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।

আজ যে ব্যক্তি অন্যের দুর্নীতির বিচার দাবি করছেন, কাল তার নিজের দলের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠলে তাকেও একইভাবে তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করার সাহস থাকতে হবে।

অবশ্যই এখানে আইনের মৌলিক নীতি ভুলে গেলে চলবে না। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত নয়। প্রত্যেক অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলেই শাস্তি হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে- ক্ষমতা যেন তদন্ত বন্ধ করার ঢাল না হয়।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্বলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন সাধারণ মানুষের জন্য আইন কঠোর, কিন্তু ক্ষমতাবানদের জন্য আইন নমনীয় হয়ে যায়।

স্পিকারের বক্তব্য তাই আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে- নিশ্চয়ই। কিন্তু, তার সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও সমান কঠোর হতে হবে।

কারণ, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা যেমন জবাবদিহির আওতায় আসবেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকা দুর্নীতিবাজও তেমনি জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারেন না।

বাংলাদেশের মানুষ এখন শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায়- দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ।

কোনো দলের জন্য আলাদা আইন নয়। কোনো ব্যক্তির জন্য আলাদা বিচার নয়। কোনো ক্ষমতাবানের জন্য আলাদা রাষ্ট্র নয়।

প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ঘুষখোর কর্মকর্তা, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকারী প্রভাবশালী ব্যক্তি—সবার জন্য একই আইনের শাসন কার্যকর হবে।

মাননীয় স্পিকারের বক্তব্যের পর তাই জনগণের প্রশ্নটি আরও স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন- 
সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে বিচার হবে, এটি যেমন জরুরি; তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় দুর্নীতি হলে তারও বিচার হবে, এটি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্র কোনো দল, সরকার কিংবা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়।

রাষ্ট্র জনগণের। আর জনগণের সম্পদের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি।

দল নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।

 

লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল 
ই-মেইল : [email protected]

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত