• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক কৃষি কাজে লাগালেই বদলাবে অর্থনীতি

মফিজুর রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৫৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক কৃষি কাজে লাগালেই বদলাবে অর্থনীতি

খাদ্য নিরাপত্তা এখনো আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। এক সময় আমাদের কৃষি অর্থনীতির বড় অংশ পাটের মত অর্থকরি ফসলের দ্বারা বেশি প্রভাবিত থাকলেও এখন কৃষি মূলত দেশের ক্রমবর্ধন জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের দিকেই অধিক নিবদ্ধ রয়েছে। দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখনো মূল্যস্ফীতি তথা খাদ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির দিকে নিবদ্ধ। খাদ্য চাহিদা পূরণে দেশের কৃষিব্যবস্থা একটি বিপরীতমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদা বাড়লেও নানাবিধ কারণে কৃষিজমির পরিমান এবং জমির ঊর্বরতা কমছে।

এমন বাস্তবতায়, উৎপাদন বাড়াতে এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে উন্নত কৃষিবীজ ও আধুনিক যান্ত্রিক কৃষি-কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। বিশেষত হাওরাঞ্চলের বিশাল কৃষি ফার্মের পাশাপাশি সারাদেশে ক্ষুদ্র ও খ-িত কৃষি খামার ও বাগানে কৃষি উৎপাদনকে সহজলভ্য করে তোলার উপযোগী আধুনিক কৃষিযন্ত্র আমদানি, উদ্ভাবন ও বিপণন জোরদার করার মাধ্যমেই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, বেসরকারী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধানকাটার মওসুম শুরু হওয়ার আগেই হাওরাঞ্চলে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যার আশঙ্কার মধ্যে ধানকেটে গোলায় তুলতে কৃষকদের দুর্ভোগ ও অনাকাক্সিক্ষত ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। কৃষকদের এ সমস্যা উত্তরণে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সরকার কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থার কথা বললেও সরকারিভাবে তার বাস্তব প্রতিফলন খুবই অপ্রতুল। তবে ধানকাটা নিয়ে কৃষকের দুর্ভোগকে পুঁজি করে সহযোগিতার নামে রাজনৈতিক দলের ধানকাটা ও মাড়াই উৎপাদনের শেষধাপ।

এর আগে জমি চাষ, বীজ বপন, চারা রোপন, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, আগাছা দমনসহ প্রতিটি স্তরেই কৃষি শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে, উৎপাদন খরচসহ কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। একই সময়ে ফসল তুলতে ও বুনতে একসাথে বিপুল সংখ্যক কৃষি শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বাস্তবতায় ফসলের উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

গত ৫ দশকে দেশের কৃষি গবেষকরা আন্তরিক প্রয়াস, মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী প্রতিভার মধ্য দিয়ে উচ্চ ফলনশীল বীজ ও নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিতে এক ধরণের বিপ্লব সংঘটিত করতে সক্ষম। তাই কৃষি প্রযুক্তি ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষিযন্ত্র সুলভ ও সহজলভ্য করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পরিককল্পনা, বিনিয়োগ ও কার্যকর উদ্যোগ দরকার। ডিজিটালাইজেশনের সাথে সাথে সব ক্ষেত্রেই যখন নতুন নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে, তখন ফসল বোনা ও কাটার জন্য আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন কিংবা আমদানি করা প্রয়োজন। হাওর অঞ্চলে বড় যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও ছোট ছোট জমিতে তা ব্যবহার করা যায় না। এ প্রেক্ষিতে, বুয়েট কিংবা চীনের সহযোগিতায় কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও আমদানি করা জরুরি। এলাকাভিত্তিক সমবায় পদ্ধতিতে আধুনিক যন্ত্র বা হারভেস্টর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। মূল ধারার কৃষিখাত, ফলবাগান, মৎস্যচাষ, পোল্ট্রিশিল্প, ডেয়ারি ও লাইভস্টক খাতের উন্নয়নে প্রতিটি ধাপে সব ধরণের আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে।

এখানে বলে রাখা ভালো, শহরের রিকশা চালনাকে সহজ জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়ায় গ্রামে মারাত্মক কৃষি-শ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে, যা ফসল উৎপাদন ব্যাহত করে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেই সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শিল্পসংযুক্ত না হওয়ায় শ্রমবাজারে অনেক তরুণ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। আবার মেধাবী শিক্ষার্থীদের দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে নেই। এ দ্বিমুখী সংকটের কারণে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে আর অন্যদিকে মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান নেই। তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে কৃষি কাজে লাগানো যেতে পারে। আমাদের কৃষি অর্থনীতির জন্য এটি হবে ইতিবাচক। 

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। মাত্র আট বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ২০ দশমিক ৪২ থেকে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে। এ অবস্থা অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রকাশ। তরুণদের অবস্থা আর সংকটময়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ দেখায় যে ২০১৬-২২ সালে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। এদের মধ্যে মাত্র ৮৭ লাখ চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ৫৩ লাখ তরুণ এখনো বেকার। যারা কাজ পেয়েছেন তাদের ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে যেখানে মজুরি ও উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও কৃষিকে পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্পায়ন করতে না পারায় এ খাতে লাভ অনিশ্চিত। ধান, পাট বা সাধারণ ফসলে বিনিয়োগের অর্থ ফিরে আসার পরিমাণই নগণ্য। তাছাড়া আবহাওয়া, সরবরাহ ও কাঠামোগত সমস্যার কারণেও এ পেশা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বিশেষায়িত অধ্যয়ন করা হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত গবেষণা, উৎপাদন প্রযুক্তির প্রয়োগ বাস্তব ক্ষেত্রে হচ্ছে না। এছাড়া এ পেশায় সামাজিক মর্যাদার অভাব। স্নাতক সম্পন্ন করা কোনো তরুণ নিজেকে কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বোধ করেন না। এক্ষেত্রে দক্ষতার স্বল্পতাও বড় কারণ। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষায় শেখানো হয় না।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হলেও শিল্প খাতের প্রসার ও উন্নয়ন অনেক জরুরি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এ সময়ে জনসম্পদ ব্যবহার করে শিল্প অগ্রগতি নিশ্চিত যারা করবে, তারাই ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে পারবে।  

একজন প্রতিভাবান তরুণ, যার কোটা নেই বা যিনি শহরের বাইরে থাকেন, তিনি চাকরি পান না। এটি গুণীদের বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য করে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নীতি অনুসরণ করে সেরা মস্তিষ্ক আকৃষ্ট করে। আমরা কেন আমাদের নিজস্ব প্রতিভা ধরে রাখতে পারি না? সরকারি খাত যদি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক নিয়োগ নেয়, তবে বেসরকারি খাতও অনুসরণ করবে। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে যে যোগ্যতাই একমাত্র মানদণ্ড।

সরকারকে বুঝতে হবে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ শেষ হয়ে আসছে। আজকের যুবকরা যদি কর্মসংস্থান না পান, তবে আগামী দশকে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে। বেকারত্বের ফলে সামাজিক অশান্তিও অনিবার্য। এজন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষা কারিকুলাম দ্রুত পরিবর্তন করা, অবকাঠামায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ছোট-মাঝারি উদ্যোগে সহজ ঋণ প্রদান—এসব অবিলম্বে করতে হবে। বিলম্ব করলে লাখ লাখ তরুণ হতাশা ও দারিদ্র্যের শিকার হবে। 

লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল গ্রুপ।

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: