• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ, ৭ বছরেও চালু হয়নি রংপুরের শিশু হাসপাতাল

রংপুর ব্যুরো 

প্রকাশিত: ১৫:২৭, ১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৫:২৭, ১ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ, ৭ বছরেও চালু হয়নি রংপুরের শিশু হাসপাতাল

নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় সাত বছর আগে। ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আছে আধুনিক ভবন, অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, কেবিন, ল্যাব, অক্সিজেন প্লান্টসহ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। অথচ চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি রংপুরের ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল। সর্বশেষ গত ১ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব এক থেকে দুই মাসের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস দিলেও সেই সময় পেরিয়ে গেছে। অগ্রগতি হিসেবে হাসপাতালে এসেছে কেবল কিছু আসবাবপত্র। যন্ত্রপাতি ও জনবল পদায়নের বিষয়ে এখনো নেই সুনির্দিষ্ট তথ্য। 

ফলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে হাসপাতালের অধিকাংশ কক্ষ। সীমিত পরিসরে শুধু বহির্বিভাগের চিকিৎসা চলছে। আর পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু না হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীর চাপে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালকে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্যমতে, রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের এক একর ৭৮ শতাংশ জমির ওপর উত্তরবঙ্গের প্রথম সরকারি ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা। দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় আড়াই মাস আগেই ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

২০২০ সালের ৮ মার্চ হাসপাতাল ভবনটি সিভিল সার্জনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ওই বছরের শুরুতেই হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর কথা ছিলো। কিন্তু এরই মধ্যে দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে হাসপাতালটি করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে সেখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। এতে পিছিয়ে যায় শিশু হাসপাতালের মূল কার্যক্রম। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবল সৃষ্টিসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পরও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দফতর সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব করে ২০২৩ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। হাসপাতালটির পেছনে বছরে ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ টাকা ব্যয় হবে বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন হয়নি।

২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি শিশু হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে রমেক হাসপাতালের বর্ধিত শিশু বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের নিচতলার তিনটি কক্ষে বহির্বিভাগ চালু করা হয়। সেখানে শুধু টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে; রোগী ভর্তির সুযোগ নেই।

এর মধ্যে গত ১ আগস্ট হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার অতিরিক্ত সচিব আরিফ আহমদ। হাসপাতালের আউটডোর, ইনডোর, প্রবেশদ্বার ও অক্সিজেন প্লান্ট পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, সেপ্টেম্বরের মধ্যে রংপুরসহ সারাদেশে নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং জনবল নিয়োগের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আরও জানান, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং আগস্টের মধ্যেই হাসপাতালে যন্ত্রপাতি পৌঁছাবে। পাশাপাশি পদ সৃষ্টির বিষয়টি অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর শুরু হলেও হাসপাতালে আসেনি চিকিৎসা সরঞ্জাম। হয়নি চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নও। সম্প্রতি তিন গাড়ি আসবাবপত্র হাসপাতালে ঢুকেছে বলে জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, সম্প্রতি তিন গাড়ি আসবাবপত্র হাসপাতালে ঢুকেছে। আসবাবপত্র ঢোকানো শেষ হলে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি কবে আসবে এবং কবে হাসপাতাল চালু হবে, তা জানা নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব হবে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতিটি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। রয়েছে চারতলা ভিত্তির তিনতলা সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার, ছয়তলা ডক্টরস কোয়ার্টার, ছয়তলা স্টাফ ও নার্স কোয়ার্টার, দুইতলা গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার এবং বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ভবন।

মূল হাসপাতাল ভবনের প্রথম তলায় থাকবে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের চেম্বার ও ল্যাব। দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার ও ব্রোন ইউনিট এবং তৃতীয় তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন। আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হলেও বর্তমানে অধিকাংশ কক্ষই অব্যবহৃত।

হাসপাতালে বর্তমানে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও চারজন কনসালট্যান্ট প্রেষণে সংযুক্ত রয়েছেন। প্রতিদিন একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও একজন কনসালট্যান্ট সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। তবে অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় শিশুদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ নেই।
রমেকে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ

রংপুর শিশু হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় পুরো বিভাগের শিশু রোগীদের বড় একটি অংশের চিকিৎসার চাপ পড়ছে রমেক হাসপাতালের ওপর। সেখানে শিশুদের জন্য ১০৮টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ শিশু ভর্তি থাকে। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

নগরীর, কেরানী পাড়ার বাসিন্দা জোসনা বেগম বলেন, ‘এ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের চিকিৎসার বড় ভরসা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে সবসময় রোগীর চাপ থাকে। ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে স্বল্প খরচে শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যেত।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রোগীর চাপে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শয্যার তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। শিশু ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। শিশুদের সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করে দ্রুত অন্তর্বিভাগের কার্যক্রম চালুর দাবি জানান তিনি।

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত